ষড়যন্ত্র আর অক্ষমতার কারণে জুলাইয়ের সুফল বাংলাদেশ পায়নি বলে মনে করেন শহীদ আসহাবুল ইয়ামিনের বাবা সাবেক ব্যাংকার মো. মহিউদ্দিন। এখানে জুলাইযোদ্ধাদের দুর্বলতাও রয়েছে। ব্যাংক খাতে লুটপাটের সহযোগী হবেন না-এজন্য ২০১৭ সালে চাকরি ছেড়েছিলেন তিনি। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জুলাই আন্দোলন এবং এর দেনা-পাওনার মূল্যায়ন ও শিক্ষা নিয়ে কথা বলেন জুলাইয়ে আলোচিত শহীদ আসহাবুল ইয়ামিনের বাবা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ৮ই আগস্ট-ই জুলাই আমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। যাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তাদের কেউ শহীদ হয়নি। তারা পিঠ বাঁচিয়ে চলে গেছে। অতীতেও তাই হয়েছে। যাদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে গেছে তাদেরও কেউ রক্ত দেয়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। এখন আমাদের অবস্থা হলো ‘যে লাউ সেই কদু’। কারণ আমরা যাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছি তাদের কিছু হারায়নি। যারা ক্ষমতায় এসেছে তারাও তেমন কিছু হারাননি। তিনি বলেন, যার হারায় সেই জানে হারানোর বেদনা। এজন্য আমি ছাত্রদের ইমম্যাচিউরিটিকে দায়ী করবো। তারা ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে গেছে। বিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। আমরা জানি বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব হয়। সেটা সশস্ত্র বিপ্লবও হতে পারে। আমাদের দেশে হয়েছে ষড়যন্ত্র। এসব কারণে বিপ্লাবের সুফল পায়নি দেশ।
বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক সরকার হওয়ার পরও গণভোটের বৈধতা না দেওয়ার সমালোচনা করে শহীদের বাবা মহিউদ্দিন বলেন, তারা কেন জুলাই সনদের স্বীকৃতি দিচ্ছে না। গণভোটকে মূল্যায়ন করছে না। জনগণের ভোটে স্বীকৃত জুলাই সনদকে গ্রহণ না করলে বর্তমান সরকারের কি বৈধতা থাকে ? তিনি বলেন দেশে এখন যে অবস্থা ‘যেই লাউ সেই কদু’। মুর্খ, চাঁদাবাজ ঘুষখোররা দেশ পরিচালনা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি। আগামী জুলাই কেমন বাংলাদেশ চান ? জানতে চাইলে শহীদ আসহাবুল ইয়ামিনের বাবা বলেন, একজন শহীদের বাবা হিসেবে অবশ্যই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই। আমাদের সন্তানরা বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের জন্য শহীদ হয়েছে। আমিও চাই বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঘাতকের বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে শহীদ হন সাভারের এমআইএসটি’র মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন আসহাবুল ইয়ামিন। ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছিল। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাভারসহ সারাদেশ ছিল প্রায় অচল। সব জায়গার মতো সাভারেও চলছিল শিক্ষার্থী ও জনতার দুর্বার আন্দোলন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-জনতাকে লক্ষ্য করে পুলিশ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা যখন গুলি ছুড়তে থাকে তখন গুলি থামাতে পুলিশের সাঁজোয়া যান এপিসিতে উঠে পড়ে রাজধানী মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন। এসময় ঘাতক পুলিশ খুব কাছ থেকে ইয়ামিনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। ইয়ামিন যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল তখন পুলিশের এক সদস্য একপর্যায়ে পুলিশের এপিসি থেকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে নিচে রাস্তায় ফেলে দেয়। তখনও ছটফট করছিল ইয়ামিন। এর কিছুক্ষণ পরই ইয়ামিন শহীদ হন। ঢাকা জেলা ১৪ নামের মার্কিং করা গাড়িটির ওপর ইয়ামিনের দেহটি দেখা যায়। কালো জামা, নীল প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় ইয়ামিনের গুলিবিদ্ধ নিথর দেহটি এসময় এপিসির ওপর আটকে ছিল। এই আটকে থাকা দেহ নিয়েই পুলিশের রায়ট কারটি পেছনে ফিরে আসে। পুলিশের সাঁজোয়া যানটি থামিয়ে সাইড থেকে এক পুলিশ বেরিয়ে আসে। এসময় সাজোয়া যানের ওপর থেকে আরেক পুলিশ সদস্য বেড়িয়ে এসে ইয়ামিনের নিথর দেহটা সরানোর চেষ্টা করে। সাইডের গেট খুলে বের হওয়া এক পুলিশ সদস্য ইয়ামিনের নিথর দেহটার প্যান্টে হ্যাচকা টান দিয়ে কারের ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়।
এপিসির ঠিক পাশেই নিচে পড়ে দেহটা। এপিসির চাকার সাথে লেগে থাকায় আবার টেনে-হিঁচড়ে আরেকটু সাইডে আনা হয়। তখনও ইয়ামিনের দেহে প্রাণ ছিল। পরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন নির্মম মৃত্যুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ভিন্ন মাত্রা পায়। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে পুরো দেশজুড়ে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষও রাস্তায় নেমে আসে।
শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের এক বোন রয়েছে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে ইয়ামিন ছিলেন ছোট। তিনি সাভারের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। বুয়েট ও রংপুর মেডিকেলে চান্স পেলেও ভর্তি হয়েছিল মিরপুরের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে। বসবাস করতেন বাবা-মা ও বোনের সাথে সাভারের ব্যাংক টাউনে।