বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী
রাজশাহীর ঐতিহাসিক ‘বড়কুঠি’ একাধারে ওলন্দাজ, ব্রিটিশ ও সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত একটি স্থাপনা। রাজশাহী শহর গড়ে ওঠার প্রারম্ভিক সময়ে এটি তৈরি হয়। বিগত কিছুকাল যাবত এর কর্তৃত্ব নিয়ে টানাটানি চলছে। তবে এটি বরেন্দ্র জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে রাখলে এই টানাপোড়েনের অবসান হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
বিবরণে বলা হয়, রাজশাহীর বর্তমান প্রাণকেন্দ্রে একটি প্রাণবন্ত জনপদ গড়ে ওঠে মূলত ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে হজরত শাহ্ মখদুম রূপোষ (রহ.)-এর আগমনকে কেন্দ্র করে। আর আধুনিক রাজশাহী শহরের প্রশাসনিক গোড়াপত্তন হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে- ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে। তারও আগে সপ্তদশ শতকের শুরু থেকে রেশম ও অন্যান্য শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন, গুদামজাতকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং সর্বোপরি শিল্পের তত্ত্বাবধান করার জন্য রাজশাহী শহরের আশপাশে গড়ে ওঠে ছোটবড় নানান আকৃৃতির পণ্যশালা বা আবাসগৃহ। এগুলো সাধারণত কুঠি বা কোঠা নামে পরিচিত। এরই অংশ হিসেবে ডাচ বা ওলন্দাজ বণিকরা নির্মাণ করেন এই বড়কুঠি নামক স্থাপনাটি। বর্তমানে টিকে থাকা রাজশাহীর সবচেয়ে পুরাতন ভবন এটি। পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই ভবনের নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। তবে মনে করা হয়, এই ইমারতটি নির্মিত হয়েছিল অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগে। পরে এটির মালিকানা চলে যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।
বড়কুঠি ১২ কামরাবিশিষ্ট একটি দ্বিতল ভবন। এই ভবনের মূল অবকাঠমোর দৈর্ঘ ৮২ ফুট এবং প্রস্থ ৬৭ ফুট। ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি হলঘরসহ ৬টি কক্ষ এবং নিচের তলায় ৬টি কক্ষের উপস্থিতি দেখা যায়। উপর তলার কক্ষগুলো সম্ভবত আবাসিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো। নিচতলার কক্ষগুলোতে রেশমপণ্য গুদামজাত করা হতো। আবার কখনো কখনো এই কক্ষগুলোতে বন্দিদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো বলেও মনে করেন অনেকেই। ওলন্দাজরা শুধু বাণিজ্যিক ও আবাসনের জন্যই এই ভবন নির্মাণ করেনি বরং নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে একে অনেকটা দুর্গের আদলে নির্মাণ করেছিল। কারণ কুঠির প্রত্যেক ধারে নিরাপত্তা টাওয়ারের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তী সময়ে এখান থেকে বেশকিছু ছোটবড় কামান ও অস্ত্রশস্ত্রেরও সন্ধান পাওয়া যায়।
মালিকানার হাতবদল
১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের সময় এই ভবন সিপাহী বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায়। তবে অচিরেই তা মুক্ত করে ব্রিটিশরা এবং এটি ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবকদের আঞ্চলিক হেডকোয়ার্টারস বা ক্যাভালরি কোম্পানির সদরদপ্তর ‘রাজশাহী ক্যাভালরি কোম্পানি’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উনবিংশ শতকের শেষদিকে বা বিংশ শতকের প্রারম্ভে এই বড়কুঠি ইমারতটি মেদিনীপুর জমিদারী কোম্পানির অধীনস্ত হয় এবং এটি ‘ইন্ডিয়া জেনারেল নেভিগেশন এন্ড রিভার্স স্ট্রিম’-এর স্থানীয় এজেন্টের কর্মচারীদের আবাস ও ব্যবসায়িক কাজে ভাড়া দেয়া হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলে, ১৯৫০-৫১ সালে যখন জমিদারী ব্যবস্থার বিলোপ সাধন হয়, তখন এই বড়কুঠির কর্তৃত্ব তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গ্রহণ করে এবং এটি খাস সম্পত্তিতে পরিণত হয়। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এটি রাজশাহী জেলা ও বিভাগীয় খাদ্য বিভাগের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। এরপর ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রতিষ্ঠার সময় পাকিস্তান সরকার এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অর্পণ করে। তখন এটি ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবন ও কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার হতো। পরে তা টিচার্স ক্লাব ও কর্মচারী ইউনিয়নের অফিসে রূপান্তরিত হয়।
দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় পর বড়কুঠি ভবন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের আওতায় নেয়ার চেষ্টা শুরু হয়। তৎকালীন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদান করেন। প্রস্তাবটি রাবি’র সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হলে সকল সদস্য এ প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। তবে থেমে থাকেননি লিটন। তিনি সরকারি চ্যানেল ব্যবহার করে তদবির চালালে ফলস্বরূপ ২০১৮ সালের মে মাসে বড়কুঠিকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে এটি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনস্ত হয়। প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর বড়কুঠির সংস্কার ও সংরক্ষণকাজের জন্য প্রকল্প তৈরি করে প্রথম পর্যায়ে ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করে। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে সংস্কার, সংরক্ষণ ও সিটি মিউজিয়াম করা হবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রকল্প থেমে যায়।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় পক্ষ বড়কুঠি তাদের হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি কখনোই মেনে নিতে পারেনি। তারা এটি ফিরে পেতে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রী নিযুক্ত হন রাজশাহী সদর আসনের এমপি মিজানুর রহমান মিনু। গত ৬ জুলাই মিজানুর রহমান মিনু রাবি’র একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলে বিশ^বিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা ‘যেভাবেই হোক’ বড়কুঠিকে রাবি’র কাছে ফিরিয়ে দিতে ভূমি মন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। ভূমি মন্ত্রী তাতে সম্মত হন বলে জানা যায়। তবে বিষয়টি সহজ হবে বলে মনে হয় না। কেননা, সরকারি কোনো সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার খুব সহজ প্রক্রিয়া নেই।
বরেন্দ্র জাদুঘরের অংশ হতে পারে
বড়কুঠি যেমন একটি প্রাচীন স্থাপনা তেমনই এটি একটি প্রতœসম্পদও বটে। নিরাপত্তা দেয়ালসহ এর রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি। এটি রাবি’র অধীনে ফিরিয়ে আনা গেলে একে বর্তমান বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এর সুবিধা হলো এই যে, মহানগরীর মধ্যে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর বর্তমানে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়েরই প্রতিষ্ঠান। বড়কুঠি এই জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে দেয়া খুবই যৌক্তিক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। অন্যদিকে বড়কুঠির মতো একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনাকে নিছক ক্লাবঘর বা বিনোদন কেন্দ্র কিংবা কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস করার জন্য ব্যবহার করা হলে তার কেবল অপব্যবহারই হবে। সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিদ্বজনেরা।