বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র তথা প্রেস্ক্রিপশনের দীর্ঘ ফর্দ আর ওষুধের বাড়তি দামের সঙ্গে যেন পেরে উঠছেন না তারা। ডাক্তারের চেম্বার আর প্যাথলজির বারান্দা পেরিয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে ধরা খাচ্ছেন অসহায় রোগীরা। এমনি অবস্থা চলছে রাজশাহী অঞ্চলের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে।

একজন গরীব রোগীর কণ্ঠের অসহায় প্রকাশ, “আগে যে ওষুধ ৪৫ টাকায় কিনতাম, এখন ৬০ টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে যদি দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে তো আমাদের মরে যেতে হবে।” রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীর জন্য নগরীর লক্ষ্মীপুর বাজারে প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কিনতে আসা একজনের এই আক্ষেপের মধ্যে যেন অনেক রোগীরই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। তিনি আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, চিকিৎসা ব্যয় এখন তাদের মতো নি¤œ আয়ের পরিবারের জন্য এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তারদের দেয়া নানাবিধ পরীক্ষা বা টেস্টের সাথে এখন যদি বাড়তি দামে ওষুধও কিনতে হয় তাহলে তো তাদের জন্য এ বিষয়টি অনেক কষ্টের। শুধু তিনি নন, রাজশাহীর হাজার হাজার রোগী ও স্বজন এখন ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ওষুধের দামও। ফলে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজশাহী নগরীর চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের দাম গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্য ও বাজারে বিক্রয়মূল্যের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য। বিশেষ করে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডেঙ্গু, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধগুলোর দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। রোগীরা অভিযোগ করছেন, একই ওষুধ কয়েক মাস আগেও যে দামে কিনেছেন, এখন তার জন্য অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। ক্লিনিক পাড়া হিসেবে পরিচিত নগরীর লক্ষীপুর মোড়েই রয়েছে অর্ধশতাধিক ওষুধের দোকান। এসব দোকানের বিক্রেতারা জানান, হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার কারণে কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। সেই সুযোগে অনেক ওষুধের দামও বেড়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত নাপা, সেকলো, অমিডন, মন্টেয়ার-মোনাস, এমকাস, রিভার্সএয়ারসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০ টাকার নাপা সিরাপ এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ৪৫ টাকার সেকলো ট্যাবলেটের পাতা কিনতে রোগীদের গুনতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। ফার্মেসিগুলোতে দেখা যায়, বেশি ব্যবহৃত ওষুধগুলোর দাম কয়েক ধাপে বেড়েছে। যে ইকোস্প্রিনের পাতা আগে ৬ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ট্যাবলেটের দাম ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮০ পয়সা হলেও বাজারে পাতাপ্রতি আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। জ্বরের ওষুধ প্যারাসিটামল (নাপা) ট্যাবলেটের পাতা আগে বিক্রি হতো ৮ থেকে ১০ টাকায়, বর্তমানে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। এছাড়াও লোসারটান পটাশিয়াম ৫০ মিলিগ্রাম ৮ টাকা থেকে ১০-১৫ টাকা, প্যারাসিটামল ৬৬৫ মিলিগ্রাম ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা, অ্যামলোডিপাইন-অ্যাটেনোলোল ৬ টাকা থেকে ৮ টাকা, ব্রোমাজিপাম ৩ মিলিগ্রাম ৫ টাকা থেকে ৭ টাকা, অ্যাসপিরিন ৭৫ মিলিগ্রাম ৬ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৮ টাকা, মেট্রোনিডাজল ৪০০ মিলিগ্রাম ১ টাকা থেকে ২ টাকা, মেট্রোনিডাজলের ১০ পিস স্ট্রিপ ১৪ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৩০ টাকা, ফেক্সোফেনাডিন ৮ টাকা থেকে ৯ টাকা, অ্যাজিথ্রোমাইসিন ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা, মন্টিলুকাস্ট ১৬ টাকা থেকে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা, ভিটামিন বি-১, বি-৬ ও বি-১২ ৭ টাকা থেকে ১০ টাকা, ইসমিপ্রাজল ৫ টাকা থেকে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে বেশকিছু ওষুধ দীর্ঘমেয়াদি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। ফলে নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।

চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওষুধের বাড়তি ব্যয় সামলাতে অনেক পরিবার এখন নিয়মিত খাবারের ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করাতে পারছে না। একজন রোগীর স্বজন জানালেন, “ডাক্তারের ফি, পরীক্ষা আর ওষুধ সব মিলিয়ে চিকিৎসা করানো এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে সংসারের অন্য খরচ কমিয়ে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।” আরেকজন বললেন, “জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম যদি বাড়তে থাকে তাহলে তো তাদের মতো নি¤œ আয়ের মানুষদের জন্য অনেক সমস্যা। বাড়তি দামে ওষুধ কেনা তাদের পক্ষে তো সম্ভব নয়।”

এদিকে ফার্মেসির মালিকরা বলছেন, কোম্পানি তাদেরকে যে রেট দিয়েছে, সে রেট অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দাম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে গত এক বছরে ওষুধের দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। ওষুধের দাম বাড়ায় রোগীদের কষ্টের বিষয়টা সবাই দেখছে। কিন্তু তাদেরও তো কিছু করার নেই। কোম্পানি যে দামে দেয়, তারা সেই দাম অনুযায়ী বিক্রি করে। কোম্পানি দাম কমালে তারাও কম দামে বিক্রি করবে। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ওষুধের দাম যখন বাড়ানো হয়, তখন সারাদেশেই একই রেট নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত মূল্যের বাইরে দাম নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করে চলেছে। কোথাও বেশি দামে ওষুধ বিক্রির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।