রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। এক বছর আগে এই দিনে প্রশিক্ষণ উড্ডয়নে থাকা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিদ্যালয়ের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও পাইলটসহ ৩৬ জন। এছাড়া এ ঘটনায় আহত হন আরও অনেকে। সেই ঘটনার শোক, আতঙ্ক ও স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বজন, সহপাঠী এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা।

মর্মান্তিক এই ঘটনার পর পুরো দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। দগ্ধ ও আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও কর্মচারীদের দ্রুত রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর আহতদের চিকিৎসা চলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ ও জটিল চিকিৎসা শেষে অনেকেই বাড়ি ফিরলেও, তাদের শরীরে এখনো রয়ে গেছে পোড়া ক্ষতের স্থায়ী দাগ, আর মনে রয়ে গেছে সেদিনের সেই তাড়া করে ফেরা বিভীষিকা।

শোক ও পরম শ্রদ্ধায় ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তি স্মরণ করছে মাইলস্টোন পরিবার।

এ ঘটনায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ঘটনার তিন মাস পর ১৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও ১৬৮টি তথ্য উদ্‌ঘাটনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ৩৩টি সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নজনিত ত্রুটির কারণে প্রশিক্ষণ চলাকালে পরিস্থিতি পাইলটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। জননিরাপত্তা রক্ষায় বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনার সুপারিশ করে কমিটি। একইসঙ্গে বরিশাল ও বগুড়ার বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণের তাগিদ দেওয়া হয়, যাতে নিরাপদ পরিবেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়।

এতে আরও উঠে আসে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী ভবনে অন্তত তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র একটি। পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক কম হতে পারত বলে প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়

এদিকে দুর্ঘটনার পর চিকিৎসাধীন থাকা অনেক আহত ব্যক্তি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও কেউ কেউ এখনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনার পর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিমান নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাও এক বছর পর নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর সামরিক প্রশিক্ষণ ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপত্তা প্রটোকল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনার নাম নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক। এক বছর পরও সেই দিনের স্মৃতি দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার গুরুত্ব কতটা গভীর।