পঞ্চদশ সংশোধনীর আপিল খারিজ, হাইকোর্টের রায় বহাল

স্টাফ রিপোর্টার

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের অধিকার ফিরলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার জন্য বুধবার দিন ঠিক করেন আপিল বিভাগ। গত ৬ থেকে ৮ জুলাই টানা তিনদিন আপিল শুনানি হয়।

এই আপিলে আবেদন করে পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ মামলায় আদালতে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া ও শিশির মনির।

রায়ের পর জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ আইনজীবী মো. শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ে হাইকোর্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, যা আপিল বিভাগেও বহাল থাকলো। যেসব বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ছিলÑসংবিধানের কিছু বিষয় পরিবর্তন করলে তা সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য হবে, গণভোটের বিধান বাতিল, নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল।

তিনি আরও বলেন, ‘‘চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাকি বিষয়গুলো মহান জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সংবিধান কোনও দ-বিধি না। কেউ যদি অপরাধ করে, তবে অপরাধ নির্ধারণ করবে দ-বিধি। আর প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে ফৌজদারি কার্যবিধি। পৃথিবীর কোনও সংবিধানেই শাস্তির বিধান থাকে না। আর সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে নাÑএটিও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। ৫০ বছর পরে আমরা কেউই থাকবো না, নতুন প্রজন্ম আসবে, তাদের নতুন উপলব্ধি ও শিক্ষা হবে। এ কারণেই সংবিধানকে ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ বলা হয়। সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। যদি বলা হয়, কোনও পরিবর্তন আনা যাবে না, তাহলে কি এটি বাইবেল? এটি কি কোরআন? উত্তর হলোÑনা। এ কারণেই এই অংশটুকু বাতিল করা হয়েছে।’’

এদিকে সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য ও আবেদনকারী মো. জুবাইরুল হক ভূঁইয়া বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সংবিধানের মৌলিক চেতনা ও মূল্যবোধ আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। এ রায় দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

গত ১৩ নভেম্বর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেয় আপিল বিভাগ। এরপর আপিল শুনানি শুরু হয়। এরও আগে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে তিনটি আপিল করা হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চার ব্যক্তি একটি এবং নওগাঁর বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন অন্য আপিলটি করেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অন্য একটি আপিল করেন।

এর মধ্যে সুজনের সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির করা আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। তাদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কারিশমা জাহান। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং অন্য আপিলকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির।

পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে রিট, হাইকোর্টের রায় ও আপিল

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনে আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়। বিলোপ করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন এবং আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করা হয়। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং গণভোট বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধনী) আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়।

ওই দুটি ধারাসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২৫ সালের ৮ জুলাই প্রকাশ হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুজনের সম্পাদকসহ চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল করেন। এরপর আপিল বিভাগ গত ১৩ নভেম্বর লিভ মঞ্জুর করে আদেশ দেন। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়।

আপিলের ওপর গত বছরের ৩ ডিসেম্বর শুনানি শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৪, ৭, ৮ ও ১০ ডিসেম্বর আপিলগুলোর ওপর শুনানি হয়। সর্বশেষ গত বছরের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ আপিল শুনানি চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করেন।

এর ধারাবাহিকতায় পৃথক তিনটি আপিল আদেশের জন্য আপিল বিভাগের গত ৮ মার্চের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আপিল আংশিক শ্রুত (আংশিক শুনানি হয়েছে) হিসেবে গণ্য হবে না বলে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। এর ধারাবাহিকতায় আপিলগুলো গত জুন মাসে আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ শুনানি ৬ জুলাই পর্যন্ত মুলতবি করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়।

পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পাশাপাশি অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। জাতির পিতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতিÑজাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑফিরিয়ে আনা হয়।

এছাড়া সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।

একই সঙ্গে অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়।