তোফাজ্জল হোসাইন

ফ্ল্যাটের সামনে একটি জুতা পড়ে আছে, অপরটি নেই। নিজের মেয়ের জুতা চিনতে ভুল হয়নি গর্ভধারিণী মায়ের। মায়ের কলিজায় দাগা দিলো অশুভ এক চিন্তায়। মা পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে লাগলেন। বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটে, প্রতিটি দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন মেয়ের খোঁজে।

সব ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও পাশে ফ্লোরের ফ্ল্যাটটির দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি, ধাক্কাধাক্কি, বহু চেচামেচির পরও কেউ খুলছে না। এতে আরো ভয় আর অজানা আতঙ্ক, ততক্ষণে সবাই জড়ো হয়ে গেছে। ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেয়া হলো। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ফেলল।

দরজা ভেঙে ঢুকতে ঘরে ভ্যাপসা গন্ধ আর খুব অপরিষ্কার ঘর। খোঁজাখুঁজির পর খাটের নিচে রামিসার নিথর দেহ পড়ে আছে, দেহের সাথে মাথা নেই-কি নৃশংস নির্মমতা। নোংরা মেঝে লালিমায় ভেসে গিয়েছে।

আর বাথরুমের বালতি থেকে পাওয়া গেল সেই প্রিয় মুখটি, যে মুখটিতে জন্মের পর থেকে আজ অবধি এঁকেছিলেন অজস্র চুমু। চুলে ময়লা হলে যে চুলে যত্ন নিতেন, তেল দিতেন, শখ করে ঝুঁটি কিংবা বেণী করে দিতেন। সে চুল খামচে ধরেই খুনি এখানে এনে রেখেছে।

মেয়েকে শিক্ষিত করে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে স্বপ্ন দেখতেন মা এবং বাবা। সেই মাথা ঠিকই আছে। শুধু দেহের সাথে আর নেই। একজন মা একজন বাবা এই নৃশংস দৃশ্য সহ্য করবেন কীভাবে?

দরজা ভাঙার পর লাশের পাশ থেকে ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। ন্যূনতম কোনো অনুশোচনা নেই, চেহারায় নেই কোনো ভয়ের ছাপ। বিকৃত যৌনাচারের নির্মম শিকার শুধু রামিসা নয়, কত অজানার রামিসাকে জীবন দিতে হচ্ছে গঁওগেরামে-শহর-বন্দরে। কেউ ধরা খায় আর কেউ খায় না, আর যারা ধরা খায় তারা আবার আইনের ফাঁক দিয়ে অর্থের বিনিময় বের হয়ে সেই পুরনো পথে হাঁটে।

প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষের পারস্পরিক সম্মতিতে স্বাভাবিক ও প্রজননমূলক যৌন সম্পর্কের বাইরে যেকোনো অস্বাভাবিক, ক্ষতিকর বা অনৈতিক যৌন আচরণই বিকৃত যৌনাচার, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে প্যারাফিলিয়া বলা হয়। এর ফলে ব্যক্তি নিজের বা অন্যের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই বিকৃত যৌনাচারের নির্মম শিকার রামিসা।

শিশু রামিসা বয়স সাত-আট বছর বয়স। পল্লবীর ওই ঘটনায় আবারো নারকীয় বর্বরতার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ।

বিকৃত যৌন রুচির একজন সঙ্গীর চেয়ে অশান্তির আর কিছুই হতে পারে না জীবনে। একজন ভুক্তভোগী নারীই শুধু জানেন একজন বিকৃত রুচির স্বামী বা প্রেমিকের সংস্পর্শ কি ভয়ানক হতে পারে। শুধু তাই নয়, আজকাল ভয়ানক হারে বাড়ছে ধর্ষণ, শিশুকে যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতনের ঘটনাও।

আমাদের আশেপাশের একান্ত পরিচিত মানুষগুলোই করছে এসব কাজ। নিজেকে নিরাপদ রাখতে কিংবা নিজের সন্তান ও আপনজনদের নিরাপত্তার খাতিরে হলেও বিকৃত রুচির পুরুষদের চিনে রাখা এবং তাদের থেকে দূরত্ব রক্ষা করা একান্ত জরুরি।

পুলিশ মনে করছে, রামিসার প্রতি বিকৃত আকর্ষণ থেকে এই নৃশংসতা চালিয়েছে সোহেল। সোহেলের স্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার স্বামী একজন বিকৃত যৌনাচারে ব্যক্তি। সোহেল তাকেও নির্যাতন চালাত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না কেন রামিসাকে বাঁচাল না? ধারণা এমন-বিকৃত যৌনাচারের শিকার হতে হতে জাকিরের স্ত্রীও বিকৃত যৌনাচারিণীতে পরিণত হয়েছে। যার জন্য রামিসার সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংসতা সহযোগী হয়ে বাঁচানোর চেয়ে হয়ত আনন্দ বেশি পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিকৃত যৌনাচারের পর হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাভোগের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একাধিক ধারায় এ ধরনের জঘন্য অপরাধের বিচার পরিচালিত হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত) : ধর্ষণের পর হত্যাÑ এই আইনের ৯(২) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে, তবে সেই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

বিকৃত যৌনাচার ও অন্যান্য : ধর্ষণের চেষ্টা বা অন্য কোনো উপায়ে যৌন নিপীড়নের (ধারা ৯-এর অন্যান্য উপধারা) পর মৃত্যু ঘটলে তার জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিকৃত যৌনাচারের পর হত্যা বাংলাদেশের আইনে বিচার কতো দিনে সম্পূর্ণ করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচারকাজ (তদন্ত ও বিচার) ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় এই বিচার পরিচালিত হয়। অপরাধ সংঘটন বা মামলা দায়েরের পর পুলিশকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে হয়।

অভিযোগ গঠনের পর বিচারিক আদালতকে ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস অপরাধগুলোর বিচার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করার জন্য সরকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে।

বাবা-মায়েদেরকে বুঝতে হবে, সন্তান কোন রাস্তার প্রাণী নয়। যে জন্ম দিলাম আর এর দুয়ারে, ওর দুয়ারে ঘুরে ঘুরে নিজে নিজেই বড় হয়ে উঠবে।

সন্তান হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দেয়া আপনার জীবনের পাওয়া সর্বশ্রেষ্ঠ দান। সেই যুগ আর নেই যে হেলতে দুলতে সন্তান বড় করে ফেলবেন।

রামিসার বাবা মায়ের নিশ্চয়ই আফসোস হয়। বলে, ‘আল্লøাহ তুমি যদি একবার মেয়েটিকে ফেরত দিতে। তাহলে চোখে চোখে রাখতাম। চোখের আড়াল হতে দিতাম না।’ কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়।

নিরাপত্তার হাল এমন হয়েছে-যেখানে আপনার সন্তানকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেয়া যাবে না। বিশেষ করে মেয়ে সন্তান। আপনার সন্তান কার সাথে মিশছে। কার সাথে খেলছে। কোন কনটেন্ট দেখছে। আপনাকে প্রতিটি বিষয়েই নজর রাখতে হবে।

মেয়েকে ছোট ছোট শিশুদের সাথে নিশ্চিন্তে খেলাধুলা করতে দেবেন? কোনোরকমের নজরদারি ছাড়াই? ভাবছেন! ওরা তো শিশু। সেই সুযোগও আর নেই।

রামিসার মতো ফুটফুটে মিষ্টি একটি মেয়ে আজকে প্রাণ হারাল। লাশের সারি বাড়তেই আছে। এমন হাজার হাজার লাশ আমরা পেরিয়ে এসেছি। তবুও প্রতিকার নেই।