ইরানযুদ্ধ আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিয়েতনামের চেয়েও ইরানে বড় পরাজয় ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের। এমন পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে যুদ্ধে জড়ালো কেন যুক্তরাষ্ট্র? শুধু অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা থাকলেই হয় না, যুদ্ধে বিজয়ের জন্য নৈতিক ভিত্তিও থাকতে হয়; যা ইরান ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না। নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ইরানে আক্রমণ করলেও যুদ্ধটা হয়ে উঠেছিল ট্রাম্পের নিজের। ফলে দায়টা তার ওপরই বর্তাবে। আর যুদ্ধাপরাধের বড় দায় তো বহু আগেই নেতানিয়াহুর ঘাড়ে চেপে আছে। তার ওপর আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আছে। ফিলিস্তিনে নেতানিয়াহুর অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। এখন অনেকেই বলছেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয় ঘটেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের চেয়েও এবার ইরানে অনেক বড় কৌশলগত বিপর্যয় ঘটেছে দেশটির। এ ব্যাপারে ফরেন পলিসিতে লিখেছেন কাতারের জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল মুসগ্রেভ। তিনি লিখেন, ইরানযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় অন্য যুদ্ধে দেশটির পরাজয়ের মতোই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ এবং ইরান থেকে আমেরিকার দূরত্ব বেশি হওয়ায় দেশটির ওপর যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট নয়। আর ১৮১৪ সালের মতো হোয়াইট হাউসে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেনি। ফলে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষতিটা সহজে বোঝা যাচ্ছে না। পল মুসগ্রেভ বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে আমার কর্মস্থল কাতারের দোহায় মাথার ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে দেখেছি। সে সময় যখনই গাড়িতে তেল ভরেছি, দোকান থেকে গ্রোসারিজ কিনেছি কিংবা জুমকলে সহকর্মীদের সঙ্গে মিটিং করেছি, প্রত্যেকটি সময় নিজেকে প্রশ্ন করেছিÑ আমি কি যুদ্ধকবলিত এলাকায় রয়েছি? অন্যদিকে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কম সেনা নিহত হওয়ায় দেশটি পরাজয়কে আড়াল করছে। পল মুসগ্রেভ উল্লেখ করেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যাপ্তি ছিল ব্যাপক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ ও জঙ্গলজুড়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এ যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার ছিল মার্কিন নাগরিক। এ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এতটাই তিক্ত ছিল যে, একটি প্রজন্মজুড়ে মার্কিনীরা যখন ‘ভিয়েতনাম’ শব্দটি উচ্চারণ করতো, তখন তারা সে নামের দেশটিকে বোঝাতো না, বরং এটি দিয়ে আমেরিকার নিজস্ব তিক্ত অভিজ্ঞতাকে বোঝাতো। বহু সাধারণ আমেরিকানের কাছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল ব্যক্তিগত বেদনার প্রতীক। দেশটির কিছু প্রভাবশালীর কাছে এটি ছিল ক্ষমতার অহংকারের বিপদ সম্পর্কে সতর্কবার্তা, আবার অন্যদের কাছে এটি ছিল কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তের উদাহরণ। তবে জাতীয়ভাবে একটি বিষয়ে ঐকমত্য ছিল যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ছিল আমেরিকার ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২০১৪ সালের এক জরিপে ৫৮ শতাংশ আমেরিকান এটিকে ‘অন্ধকার সময়’ বলে উল্লেখ করেন, দেশটির মাত্র ১২ শতাংশ নাগরিক ভিন্নমত পোষণ করেন।

এদিকে ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে পল মুসগ্রেভ বলেন, এ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং তার কৌশলগত লক্ষ্যগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের চিত্র থেকে ভিন্নতর। ইরানযুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রের প্রযুক্তিগত সাফল্য থাকলেও যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ভা-ারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ইরানের চেয়ে শক্তিশালী কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানযুদ্ধে স্মরণীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র হতে পারে- প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের মধ্যে ভুল ডেটাবেজের কারণে নিহত ইরানী স্কুলছাত্রীদের রক্তাক্ত ব্যাগ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে যেমন সফল হয়েছে, তেমনি ইরান সেগুলো ভেদ করতেও সক্ষম হয়েছে। এখানেও যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য প্রশ্নের সম্মুখীন। কৌশলগত দিক থেকে ফলাফল আরো নেতিবাচক। যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী হামলার মাধ্যমে ইরানে সরকার পরিবর্তন করতে চাইলেও তাতে সক্ষম হয়নি, বরং এর ফল হয়েছে উল্টো। ইরানের নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডের হাতে চলে গেছে। এছাড়া ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা প্রথমদিকে কার্যকর হলেও শেষের দিকে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। অন্যদিকে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো। ফলে তৃতীয়বারের মতো ইরান হামলা থেকে তার পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো রক্ষা করতে পারবে-এমন ধারণা প্রচলিত হয়ে গেছে। এছাড়া বিশ^রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপরও ইরান যুদ্ধে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলো যুদ্ধের চাপ বহন করছে। একই সঙ্গে ইরান দেখিয়েছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ^ অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। উল্লেখ্য, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সহজেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে দূরে সরে যেতে পেরেছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে তা বেশ কঠিন হবে। কারণ এখনকার বিশ^অর্থনীতি উপসাগরীয় অঞ্চলের জ¦ালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এদিকে ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে আরো সংঘাতের আশংকা রয়েছে। এমন বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মিত্রদের আস্থা কমবে, যুদ্ধের খরচ বহনের ব্যাপারে জনগণের আগ্রহও হ্রাস পাবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে আরো উৎসাহী হবে। তখন হয়তো বেশ বড় হয়ে এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হবে- যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরান যুদ্ধে জড়িয়েছিল, যেমন প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর।

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরান যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে ইসরাইলও। যুদ্ধ থেকে আমেরিকার পিছু হটা এবং ইরানের সাথে চুক্তি সম্পাদন সৃষ্টি করেছে নতুন পরিস্থিতি। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উচ্চাকাক্সক্ষায় বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দমন করতে ব্যর্থ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়ে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নির্ধারণ করেছিলেন, তা আপতত ব্যর্থ হয়েছে। গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে ‘ইরান-যুদ্ধ’ সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইরান ‘সরকার’ও ‘শাসনব্যবস্থা’ পরিবর্তনের মার্কিন প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বন্ধু ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি নেতানিয়াহুর জন্য বড় বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের ভিন্ন উপায় ছিল না। যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে সরে আসাটা ছিল ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। যুদ্ধের কারণে আমেরিকায় জ¦ালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিচে নেমে গেছে এবং নিজের দলের ভেতরেই তিনি বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।

ইসরাইলের ভেতরেও চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। চ্যানেল ১৩-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডিভিড জানিয়েছেন, যুুদ্ধের পর এ অঞ্চলে ইসরাইলের পরিবর্তে ইরান শীর্ষ সামরিক শক্তির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমেরিকা ছাড়া ইসরাইলের কোনো অস্তিত্ব থাকতো না। আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশ^াসঘাতকতার অভিযোগ তৈরি হয়েছে। উগ্র ডানপন্থী এবং বিরোধী দলগুলো এখন ইসরাইলকে ‘এককভাবে’ চলার আহ্বান জানাচ্ছে। বিরোধীদলীয় নেতা আভিগডোর লিবারম্যান ইসরাইলকে একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ফোর্স তৈরি এবং মোসাদকে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে একক মনোযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। উপলব্ধি করা যায়, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইসরাইলের স্বপ্ন আপাতত ধূলিসাৎ হওয়ায় দেশটির নেতৃবৃন্দ এখন বেশ ক্ষুব্ধ ও হাতাশ। ফলে তারা উগ্র কথা বলছেন এবং ভুল পথ নকশার হুমকি দিচ্ছেন। ট্রাম্পের কিছুটা বোধোদয় ঘটলেও নেতানিয়াহুর তেমন সৌভাগ্য হয়নি। তিনি হয়তো ব্যালিস্টিক মিসাইল ফোর্সের কথাই ভাববেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধে তো প্রমাণ হলো- অস্ত্র নয়, যুদ্ধে জয়ের জন্য প্রয়োজন নৈতিক ভিত্তি।