ইতিহাসের একটি অমোঘ সত্য হলো, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ক্ষোভ যখন দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়, তখন তা কেবল একটি ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা এখন আর শুধু একটি পরীক্ষার স্বচ্ছতা বা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে। নিট ভারতের চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সে পরিশ্রম, মেধা এবং প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে পুনঃপরীক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
গত সোমবার নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও তার আশপাশে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা সাম্প্রতিক ভারতের অন্যতম বড় ছাত্র সমাবেশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান। পুলিশ শেষ পর্যন্ত কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে আন্দোলন সরকারের জন্য কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, রাজনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মূলত তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে। প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিত এ আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের অধিকার আদায়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ও সংগঠিত।
অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং তাঁকে জোরপূর্বক সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আন্দোলনে নতুন গতি যোগ করেছে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষোভ দ্রুত বৃহত্তর জনঅসন্তোষে রূপ নিতে শুরু করে।
সরকারের প্রতিক্রিয়াও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরে পরিস্থিতির অবনতি দেখে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ এবং শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক, এসবই প্রমাণ করে যে সরকার পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়েছে। একই সময়ে সংসদের ভেতরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানসহ শীর্ষ নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠকও স্পষ্ট করে, বিষয়টিকে আর একটি সাধারণ ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে দেখা হচ্ছিল না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষোভের জবাব শক্তি প্রয়োগ দিয়ে নয়, আস্থার মাধ্যমে দিতে হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারত সরকারের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। কিন্তু সংকটের শুরুতে কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। পরে সরকার আলোচনায় বসলেও ততক্ষণে আন্দোলন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। যখন তরুণদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হয় এবং রাষ্ট্র সংকটকে কেবল প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করতে চায়, তখন আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। অবশ্য বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা করা যাবে না। দু’দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু একটি জায়গায় দুই অভিজ্ঞতার মিল স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, মেধা ও ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে জনগণের আস্থা নষ্ট হলে সে ক্ষোভ খুব দ্রুত রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ছাত্রসমাজ আবারও পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্ম কোনো দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা এবং জবাবদিহিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা দুর্নীতির মতো প্রশ্নে তাদের প্রতিক্রিয়া আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত এবং ব্যাপক। দিল্লির রাজপথ সেই নতুন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।