আওয়ামী সরকারের পতনের পর নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে তলানীতে এসে ঠেকেছে। বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ অবনতি শুরু হলেও নতুন সরকারের আমলেও সে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্লেখ্য, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর রাজ্যের মুসলমানরা নানাবিধ সমস্যা ও সঙ্কটের মুখে পড়েছেন। এবার তাদেরকে গরু কুরবানি দিতে দেওয়া হয়নি। মাইকে আযানের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। খোলা জায়গায় নামাজ আদায়ের ওপরও রীতিমত আরোপ করা হয়েছে কঠোরতা। যা সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং ভারতের মত বৃহত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি এবং আদর্শের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
একথা কারো অজানা নয় যে, আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতে উদ্বেগজনকভাবে উগ্রবাদের উত্থান ঘটেছে। সে ধারাবাহিকতায় দেশটির পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারের নেতৃত্ব বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের সাথেও বৈরিতামূলক আচরণ শুরু করা হয়েছে। এমনকি খোদ মুখ্যমন্ত্রীও এমন কর্মকা-ে সরাসরি অংশ নিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। যা একজন ক্ষমতাসীন রাজনীতিকের সম্মান ও পদমর্যাদার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উল্লেখ্য, পশ্চিম বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ দখলের হুমকী দিয়ে আসছেন। এমনকি পতিত ও পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের এখনও বৈধ প্রধানমন্ত্রী দাবি করে আবারও ক্ষমতায় বসানোর মত অনাকাক্সিক্ষত ও দায়িত্বহীন কথাবার্তা বলছেন দীর্ঘদিন ধরেই। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রীতিমত অসম্মান ও অশ্রদ্ধা।
একই সাথে পশ্চিম বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে পরিকল্পিতভাবেই উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সীমান্ত কিলিংও বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। এমতাবস্থায় প্রতিবেশী দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। জাতীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের দ্বিচারি আচরণে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন ঢাকা-দিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। একদিকে প্রতিনিয়ত বলা হচ্ছে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চায়; অন্যদিকে অবৈধ বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিদিন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা করছে বিএসএফ। সীমান্ত এলাকার স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে ভারত এমনটা করছে। যদিও কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বিজিবি হার্ডলাইনে অবস্থান নিয়েছে। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএসএফের এমন অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে বিজিবি।
মূলত, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর সীমান্তে এমন প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে প্রায়ই সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা অব্যাহত রয়েছে। ভারত সরকারের এমন উদ্ভট আচরণে বাংলদেশের জনগণ ও সচেতন মহলে ক্রমেই ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছে। কোনো অবৈধ বসবাসকারী চিহ্নিত হলে তাকে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু ভারতে এক্ষেত্রে আইনানুগ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে না। অভিযোগ উঠেছে, ভারত এ রকম প্রক্রিয়ার কথা মুখে বললেও কার্যত বেছে নিয়েছে পুশইনের মতো অপেশাদার ও অমানবিক পন্থা। যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মূলত, ভারত এক ধরনের মিশ্র মেসেজ দিচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সম্প্রতি বলেছেন, ভারতে বসবাসকারী অবৈধ বাংলাদেশিদের বিষয়ে বাংলাদেশ যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সেটি একটি যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব। কিন্তু বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের বিএসএফ পুশইনের যে ঘটনা তাতে বাংলাদেশের জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তারা একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কোনো কোনো সীমান্তে দেখা যাচ্ছে বিজিবির সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণও সম্পৃক্ত হচ্ছেন। যা সীমান্ত পরিস্থিতিকে জটিল ও অস্থির করে তুলেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেকে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার বলে মনে করে কূটনৈতিক মহল। কারণ জনগণও যদি সম্পৃক্ত হয়ে যায় তাহলে নতুন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে একবার দু’দেশের জনগণের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই জনগণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। সমস্যা সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং কূটনীতিক চ্যানেলে আলাপ-আলোচনা করার কোন বিকল্প নেই। প্রতিটি দেশেরই এসব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নীতিমালা রয়েছে। সেগুলো মেনেই পরিস্থিতির সমাধান করতে হবে।
মূলত, ভারত সরকার বছরখানেক আগে দেশটিতে অবৈধ বসবাসকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছিল। সেখানে বারবার উঠে আসে অবৈধ বাংলাদেশিদের কথা। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির জ্যেষ্ঠ প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী জিতলে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিবেন বলেও জানান। কিন্তু এ বিষয়ে তারা পেশীশক্তিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। বাংলাভাষী মুসলমান হলেই তারা কথিত বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অশুভ প্রবণতা শুরু করেছে। যা কোন প্রতিবেশী সুলভ ও দায়িত্বশীল আচরণ নয় বরং আইন মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন।
এমতাবস্থায় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে দু’প্রতিবেশীকেই আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করতে হবে। এর ব্যত্যয় হবে অনাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।