যে কোন দেশে একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিশন যদি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব ক্ষমতাসীন দল থেকে শুরু করে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং দেশের সাধারণ নাগরিকদের ওপর পড়বে। ২০২৫ সালে দেশে একটি মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের আনা জাতীয় ‘মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ রহিত করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করে আনা বিল জাতীয় সংসদে পাস হয় গত এপ্রিলে। ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিনে বিরোধী দলের আপত্তির মুখে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর সমালোচনা করে বলা হয় মানুষ বিচার পাবে না, তার মানবাধিকার লংঘিত হবে। এ বিষয়ে দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সংস্থা থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এর পর বর্তমান সরকার একটি মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬ প্রণয়ন করে। গত ১৭ মে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে একটি অংশীজন সভায় মন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬” এর খসড়া উত্থাপন করেন।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান খসড়ার ভিত্তিতে কমিশন গঠিত হলে তা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। গত বুধবার এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা একটি স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জনআকাক্সক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। এ কারণে আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ এবং টিআইবির প্রস্তাবিত ১৯ দফা সুপারিশ বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, খসড়া আইনের ৩(২) ধারায় কমিশন কোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি বিভাগের অধীন হবে না এমন গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাদ দেয়া হয়েছে। এতে কমিশনের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দু’জন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল পরিদর্শন ও তদন্তের ক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে। পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তা বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশনের স্বাধীন ক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খসড়া আইনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। এ ছাড়া কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রেষণে নিয়োগের হার কমানো এবং বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
আমরা মনে করি এ খসড়ার মাধ্যমে যা করা হচ্ছে তা দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। টিআইবিসহ মানুষের উদ্বেগকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে স্বচ্ছতা আনতে হলে বিভিন্ন সংস্থার উদ্বেগের বিষয়টিকে বিবেচনায় নেয়া উচিত বলে আমরা করি। মানবাধিকারের বিষয়টিকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের আলোকে আমরা দেখতে চাই। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পরিবর্ত আনা হোক।