ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBPLC) শুধু একটি সাধারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; গত চার দশকে এটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির (Macroeconomy) অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংকটি কীভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য ‘অপরিহার্য’ হয়ে উঠেছে, তা কয়েকটি মূল খাতের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়।

এখানে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো কেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এতটা অপরিহার্য:

রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আনয়নে অবিসংবাদিত নেতৃত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় লাইফলাইন হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্স দেশে আনার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের অবদান সবচেয়ে বেশি। ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসা মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (২৯% থেকে ৩৮%) এককভাবে এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে ইসলামী ব্যাংকের এই বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ আক্ষরিক অর্থেই দেশের অর্থনীতির ঢাল হিসেবে কাজ করে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের জন্য ব্যাংকটি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ‘রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছে।

তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) ও শিল্পায়নের সূতিকাগার

আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে যে শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে, তার নেপথ্যে ইসলামী ব্যাংকের প্রাথমিক অর্থায়নের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে চীনের বাইরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংক ছিল একজন ‘পথপ্রদর্শক’ (Pioneer)। বর্তমানে দেশের ৬ হাজারেরও বেশি বৃহৎ শিল্প প্রকল্পে ব্যাংকটির সরাসরি বিনিয়োগ রয়েছে, যা দেশের রপ্তানি আয় ও জিডিপিতে (GDP) বড় অবদান রাখছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং বিপুল কর্মসংস্থান

দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয় এসএমই খাতকে। দেশের সর্ববৃহৎ এসএমই অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এ পর্যন্ত ২০ লাখেরও বেশি উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করেছে। এর ফলে দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে এটি একটি যুগান্তকারী অবদান।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির রূপান্তর

অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন শহরকেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, ইসলামী ব্যাংক তখন ‘পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (RDS)’-এর মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনেছে। এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৭ লাখ প্রান্তিক পরিবারকে ক্ষুদ্রঋণ ও কৃষি বিনিয়োগ (ফসল, মৎস্য, উচ্চফলনশীল জাত ও প্রাণিসম্পদ) প্রদান করা হয়েছে। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বিশাল আমানত ও তারল্যের যোগানদাতা

প্রায় ২ কোটিরও বেশি গ্রাহক এবং দেড় লাখ কোটি টাকার বিশাল আমানত নিয়ে ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ এই একক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যখন বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়, তখন তা পুরো দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে।

কেন এটিকে ‘Too Big to Fail’ বলা হয়?

ব্যাংকিং পরিভাষায় ইসলামী ব্যাংককে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার স্থিতিশীলতার ওপর পুরো ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালিকানা পরিবর্তন বা তারল্য সংকট সংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও, নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক) সবসময় এটিকে স্থিতিশীল রাখতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। কারণ, ইসলামী ব্যাংকের কোনো বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটলে তা শুধু এর গ্রাহকদের নয়, বরং পুরো দেশের রেমিট্যান্স, আমদানি-রপ্তানি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিশেষে, শুধু মুনাফা অর্জন নয়—বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের সেতুবন্ধন তৈরিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এক অনন্য ও অপরিহার্য ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা RMG শিল্পকে দাঁড় করাতে ইসলামী ব্যাংক শুরুতে কীভাবে সাহায্য করেছিল?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে সত্তুর ও আশির দশকের কয়েকজন সাহসী উদ্যোক্তা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানো গুটিকয়েক ব্যাংকের বড় ভূমিকা ছিল। এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBPLC) পোশাক খাতের বিকাশে সম্পূর্ণ নতুন ও যুগান্তকারী কিছু আর্থিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে, যা এই শিল্পের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে প্রমাণিত হয়।

শুরুর দিকে তৈরি পোশাক শিল্পকে দাঁড় করাতে ইসলামী ব্যাংক যেভাবে সাহায্য করেছিল, তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘মুরাবাহা’ ও ‘বাই-মুয়াজ্জাল’ বিনিয়োগ

আশির দশকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা ছিলেন একদম নতুন, তাঁদের কাছে বড় কোনো কোল্যাটারাল বা জামানত (যেমন জমি বা ভবন) ছিল না। প্রথাগত ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল।

ইসলামী ব্যাংক তখন শরীয়াহভিত্তিক মুরাবাহা (Murabaha - খরচ ও লভ্যাংশসহ বিক্রয়) এবং বাই-মুয়াজ্জাল (Bai-Muajjal - বাকিতে বিক্রয়) পদ্ধতির সুবিধা নিয়ে আসে। এই পদ্ধতিতে ব্যাংক উদ্যোক্তাকে সরাসরি টাকা না দিয়ে, তাঁর কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সুতা ও কাপড় নিজেই কিনে দিত এবং উদ্যোক্তারা তৈরি পোশাক রপ্তানি করে সেই টাকা পরিশোধ করতেন। জামানতের কড়াকড়ি না থাকায় শত শত নতুন উদ্যোক্তা কারখানা খোলার সাহস পান।

ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ((Back-to-BackLC ) সহজীকরণ

পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন ছিল ‘ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’। এর মানে হলো, বিদেশি ক্রেতা যখন পোশাক কেনার অর্ডার (Master LC) দিতেন, সেই অর্ডারকে জামানত রেখে ব্যাংক কাঁচামাল (কাপড়, বোতাম, সুতা) আমদানির জন্য আরেকটি এলসি বা ঋণপত্র খুলে দিত।

ইসলামী ব্যাংক এই ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ইস্যু করার প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পকেটের টাকা বিনিয়োগ না করেই শুধু মেধা ও শ্রম দিয়ে বিশাল বিশাল অর্ডার সরবরাহ করা সম্ভব হতো।

কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ অর্থায়ন (MPI)

বিদেশ থেকে সুতা, কাপড় বা এক্সেসরিজ বন্দরে চলে আসার পর অনেক সময় উদ্যোক্তাদের হাতে কাস্টমস ডিউটি বা বন্দর হ্যান্ডলিং চার্জ দেওয়ার মতো নগদ টাকা থাকতো না। কাঁচামাল খালাস করতে দেরি হলে শিপমেন্ট বাতিল হওয়ার ভয় থাকত।

এই সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংক মুবাহারা পোস্ট-ইমপোর্ট (MPI) বা আমদানি-পরবর্তী অর্থায়ন সুবিধা চালু করে। ব্যাংক নিজেই এই খরচগুলো পরিশোধ করে বন্দর থেকে মালামাল খালাস করে সরাসরি কারখানায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করত, যাতে উৎপাদন এক দিনের জন্যও ব্যাহত না হয়।

বৃহৎ কারখানার আধুনিকায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

ছোট ছোট ডাইং বা সেলাই কারখানা থেকে আজকের আধুনিক ও বিশাল সবুজ কারখানা (Green Factories) গড়ে তোলার পেছনে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে। কারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতি (যেমন ক্যাড-ক্যাম কাটিং মেশিন, আধুনিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট) আমদানির জন্য ব্যাংকটি ইজারা (HPSM) এবং হায়ার পারচেজ শিরকাতুল মিল্ক (ঐচঝগ) পদ্ধতিতে অর্থায়ন করে। এই পদ্ধতিতে যন্ত্রপাতি ব্যাংকের মালিকানায় কেনা হতো এবং উদ্যোক্তা ভাড়ার মতো করে কিস্তিতে টাকা শোধ করে একসময় যন্ত্রটির সম্পূর্ণ মালিক হতেন।

ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর স্বীকৃতি:

পোশাক খাতে ইসলামী ব্যাংকের এই অগ্রগামী ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী The Economist তাদের একটি প্রতিবেদনে ব্যাংকটিকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম ‘পথপ্রদর্শক’ Pioneer) হিসেবে উল্লেখ করেছিল। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এসে পণ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগের যে মডেল ইসলামী ব্যাংক চালু করেছিল, পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকও তা অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

আজ যে তৈরি পোশাক খাত থেকে বাংলাদেশ বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করছে এবং লাখ লাখ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে, তার প্রাথমিক ভিত্তি ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে ইসলামী ব্যাংকের এই উদ্ভাবনী ও ঝুঁকি-নেওয়ার মানসিকতা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (RDS) কীভাবে কাজ করে এবং এর সুবিধাগুলো কী?

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প Rural Development Scheme - RDS) মূলত দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সালে চালু করা হয়। প্রথাগত এনজিওগুলোর (NGO) ক্ষুদ্রঋণ মডেলের বিপরীতে এটি সম্পূর্ণ শরীয়াহভিত্তিক এবং কল্যাণমুখী একটি অনন্য ক্ষুদ্র-বিনিয়োগ মডেল।

নিচে এটি কীভাবে কাজ করে এবং এর প্রধান সুবিধাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (RDS) যেভাবে কাজ করে

আরডিএস (RDS) মূলত জামানতবিহীন (Collateral-free) একটি বিনিয়োগ ব্যবস্থা, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হয়:

ল গঠন ও কেন্দ্র পরিচালনা

প্রকল্পের অধীনে একটি গ্রামের সমমনা ও সম-আর্থিক অবস্থার ১৫ থেকে ৩০ জন অভাবী মানুষকে (বিশেষ করে নারীদের) নিয়ে একটি ‘কেন্দ্র’ বা দল গঠন করা হয়। ব্যাংকের একজন মাঠ কর্মকর্তা Field Officer) নিয়মিত এই কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখেন।

শরীয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ (পণ্য ক্রয়)

এটি কোনো সাধারণ সুদী ঋণ নয়। এখানে গ্রাহককে সরাসরি নগদ টাকা দেওয়া হয় না। গ্রাহক যে কাজ করতে চান (যেমন: সেলাই মেশিন কেনা, হাঁস-মুরগি পালন, বা ক্ষুদ্র ব্যবসা), ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় সামগ্রী বা কাঁচামাল কিনে গ্রাহককে সরবরাহ করে। শরীয়াহর ‘বাই-মুয়াজ্জাল’ (বাকিতে বিক্রয়) পদ্ধতিতে ব্যাংক তার ক্রয়মূল্যের সাথে সামান্য লাভ যুক্ত করে গ্রাহকের কাছে পণ্যটি বিক্রি করে।

সহজ কিস্তিতে পরিশোধ

গ্রাহক সেই সম্পদ ব্যবহার করে যে আয় করেন, তা থেকে সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে অত্যন্ত সহজ কিস্তিতে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করেন। সাধারণত মাঠ কর্মকর্তারাই সরাসরি কেন্দ্রে গিয়ে এই কিস্তি সংগ্রহ করেন।

২. আরডিএস (RDS)-এর প্রধান সুবিধাগুলো

ইসলামী ব্যাংকের এই প্রকল্পটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এর মূল সুবিধাগুলো নিচে দেওয়া হলো:

জামানতহীন বিনিয়োগ: গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের পক্ষে ব্যাংকে বন্ধক রাখার মতো কোনো সম্পদ থাকে না। আরডিএস কোনো প্রকার স্থাবর সম্পত্তি বা জামানত ছাড়াই কেবল পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে এই বিনিয়োগ সুবিধা দেয়।

নারীর ক্ষমতায়ন: এই প্রকল্পের ৯২% এরও বেশি সুবিধাভোগী হলেন গ্রামীণ নারী। এর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা নিজেরা আয়ের পথ তৈরি করতে পারছেন এবং পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বল্প বিনিয়োগের হার ও লভ্যাংশ ফেরত: অন্যান্য অনেক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের (NGO) সুদের হার যেখানে ২৫% থেকে ৩০% বা তারও বেশি হয়ে থাকে, সেখানে আরডিএস-এর বিনিয়োগের হার তুলনামূলক অনেক কম। তদুপরি, যারা নিয়মিত ও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করেন, ব্যাংক তাদের লভ্যাংশের একটি অংশ বোনাস বা ছাড় হিসেবে ফেরত দেয়।

সঞ্চয়ী মনোভাব তৈরি ও বাধ্যতামূলক বীমা: প্রকল্পের প্রতিটি সদস্যকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়, যা পরবর্তীতে তাদের নিজস্ব পুঁজি গঠনে সাহায্য করে। এছাড়া সদস্য বা পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি মোকাবিলায় এতে এককালীন অনুদান বা কর্জে হাসানার (সুদবিহীন ঋণ) ব্যবস্থা থাকে।

বিনামূল্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ: শুধু অর্থায়নই নয়, ব্যাংক উদ্যোক্তাদের হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু মোটাতাজাকরণ, দর্জি বিজ্ঞান ও কুটির শিল্পের ওপর বিনামূল্যে কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে তারা সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন: আরডিএস-এর আওতায় সদস্যদের জন্য স্যানিটেশন (বিনামূল্যে রিং-স্ল্যাব বিতরণ), বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য নলকূপ স্থাপন, বৃক্ষরোপণ অভিযান এবং মেধাবী সন্তানদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়।

সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান (এক নজরে আরডিএস):

বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি গ্রামে এই প্রকল্প বিস্তৃত। এ পর্যন্ত প্রায় ১৭ লাখেরও বেশি পরিবার এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হয়েছে, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে অবদান রাখছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের করণীয়।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (IBBPLC) বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। রেমিট্যান্স আনয়ন, তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ এবং গ্রামীণ অর্থায়নে এর অবদান এতই বেশি যে, এই ব্যাংকের যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা পুরো আর্থিক খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামো, পরিচালনা পর্ষদ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় যে সমস্ত উত্থান-পতন ও চ্যালেঞ্জ দেখা গেছে, তা কাটিয়ে এটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের (নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ) করণীয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।

একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান রূপে ইসলামী ব্যাংককে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে সরকারের প্রধান করণীয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ গঠন

যেকোনো ব্যাংকের মেরুদণ্ড হলো তার সুশাসন (Governance)। ইসলামী ব্যাংককে শক্তিশালী করতে সরকারকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সম্পূর্ণ পেশাদার, দক্ষ এবং সৎ পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors) নিশ্চিত করতে হবে।

করণীয়: পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক (dependent Director) , ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং শরীয়াহ বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পর্ষদের কাজে কোনো প্রকার অনাকাক্সিক্ষত বাহ্যিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

খেলাপি ঋণ (NPL) আদায় ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা

বিগত কয়েক বছরে ব্যাংকটির একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বেনামী ও অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া, যা ব্যাংকটির সম্পদকে দুর্বল করেছে।

করণীয়: বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ অডিট (Special Audit) পরিচালনা করে সমস্ত অনিয়মতান্ত্রিক বিনিয়োগ চিহ্নিত করতে হবে। যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভুয়া বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং অর্থ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

তারল্য সহায়তা ও বিশেষ বন্ড প্রবর্তন

ইসলামী ব্যাংকিং খাতের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, সংকটের সময় প্রচলিত (Conventional) ব্যাংকগুলোর মতো তারা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সহজে রেমিডি বা তারল্য সহায়তা পায় না, কারণ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক সুদের ভিত্তিতে টাকা লেনদেন করতে পারে না।

করণীয়: বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের জন্য বিশেষ লিকুইডিটি সাপোর্ট উইন্ডো (যেমন: সুকুক বা ইসলামিক বন্ডের বিপরীতে তারল্য সুবিধা) আরও সহজ ও সম্প্রসারিত করতে হবে। সাময়িক তারল্য সংকট কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি গ্যারান্টি বা সহায়তা প্রদান গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বাংলাদেশ ব্যাংক) কঠোর ও নিরপেক্ষ নজরদারি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়েই অতীতে ব্যাংকটিতে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।

করণীয়: বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগ (Large Loan Exposure) নিবিড়ভাবে মনিটর করতে হবে। ব্যাংকের ইনসাইডার ল্যান্ডিং (পরিচালকদের নিজেদের মধ্যে ঋণ নেওয়া) এবং একক গ্রাহক ঋণসীমা (Single Borrower Limit) যাতে কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

প্রবাসীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ও রেমিট্যান্স

সুবিধা বৃদ্ধি

ইসলামী ব্যাংকের মূল শক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংকটের খবর ছড়ালে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানো কমিয়ে দিতে পারেন, যা দেশের রিজার্ভের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

করণীয়: সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। বৈধ চ্যানেলে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা (Incentive) সময়োপযোগী ও আকর্ষণীয় রাখতে হবে।

শরীয়াহ নির্দেশিকা বাস্তবায়নে কঠোরতা

ইসলামী ব্যাংকের প্রতি কোটি কোটি গ্রাহকের আস্থার মূল কারণ এটি একটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংক। যদি সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয় যে ব্যাংকটি সঠিকভাবে শরীয়াহ মেনে চলছে না, তবে গ্রাহকরা আমানত সরিয়ে নিতে পারেন।

করণীয়: ব্যাংকের ‘কেন্দ্রীয় শরীয়াহ সুপারভাইজরি কাউন্সিল’-কে স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ক্ষমতা দিতে হবে। ব্যাংকটির প্রতিটি আর্থিক পণ্য ও বিনিয়োগ আসলেই শরীয়াহসম্মত উপায়ে হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পৃথক এবং শক্তিশালী ‘ইসলামিক ব্যাংকিং ইন্সপেকশন ডিপার্টমেন্ট’ গঠন করা প্রয়োজন।

সংক্ষেপে মূল কথা

ইসলামী ব্যাংককে শক্তিশালী করতে সরকারের ভূমিকা হবে একজন কঠোর কিন্তু সহায়ক অভিভাবকের মতো।

অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ, তারল্য সংকটে আর্থিক নীতিগত সহায়তা প্রদান এবং প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ পেশাদার ব্যাংকারদের হাতে ছেড়ে দেওয়াই হবে এটিকে টিকিয়ে রাখার ও শক্তিশালী করার একমাত্র কার্যকর পথ।