# ন্যায়বিচার পেলেন শহীদ-আহত পরিবারের সদস্যরা : রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর

# রায়ে সংক্ষুব্ধ সাজাপ্রাপ্ত চঞ্চলের আইনজীবী, যাবেন আপিলে

স্টাফ রিপোর্টার:

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলী করা এবং দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন ও রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রোববার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হলেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। যাবজ্জীবন প্রাপ্তরা হলেন- রামপুরা থানার সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।

এদিন বেলা ১১টা ৪৮ মিনিট থেকে রায় পড়া শুরু হয়। প্রথমেই রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। এরপর অনুমতি সাপেক্ষে এ কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি দেখানো হয়।

শুরুতেই এ মামলার আসামীদের দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা। এরপর চার্জ পড়েন বিচারক মোহিতুল হক এনাম। আর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।

এদিকে, বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে গ্রেপ্তার থাকা একমাত্র আসামী রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে এজলাসে তোলা হয়। মামলার অপর চার আসামী পলাতক রয়েছেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমির হোসেন জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার কাছে এসে তিনি সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। এসময় পুলিশ গুলী শুরু করে। আমির হোসেন দৌড়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন।

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় ওঠে। সেখানে আমির হোসেনকে পেয়ে পুলিশ সদস্যরা তার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলীও করেন। ভয়ে আমির হোসেন লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন। তখন তৃতীয় তলা থেকে একজন পুলিশ সদস্য তাকে লক্ষ্য করে ছয়টি গুলী করেন। গুলীগুলো তার দুই পায়ে লাগে।

পরে পুলিশ চলে গেলে এই যুবক ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন। তখন তার দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। তবে একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলীুতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন।

গত বছরের ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। ৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়।

ন্যায়বিচার পেলেন শহীদ-আহত পরিবারের সদস্যরা : রায়ের পর চিফ প্রসিকিউটর

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের এটি তৃতীয় রায়। আজ রামপুরার মামলার বিচার শেষে রায় প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনায় দুজন শহীদ ও একজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমানকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছর ও এসআই তরিকুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়।

আমিনুল ইসলাম বলেন, একটি বেতার বার্তার মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঠেকানোর জন্য ছাত্র-জনতার পায়ে গুলি করতে অধীনদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান। তার মৌখিক নির্দেশনা এমন থাকলেও বাস্তবে বুকে ও মাথায় গুলি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৯ জুলাই রামপুরায় গুলি চালিয়ে এভাবে হত্যাকা- চালান মামলার আসামিরা। এতে প্রাণ হারান মায়া ইসলাম ও নাহিদ ইসলাম। এছাড়া কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে নির্বিচারে গুলি চালানোর কথা স্বীকার করেছিলেন চঞ্চল চন্দ্র সরকার। স্বীকারোক্তি অনুযায়ীই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়। এজন্য তিনটি অভিযোগের একটিতে তাকে সাজা দেওয়া হয়। বাকি দুটিতে খালাস পান তিনি।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এটি একটি যথার্থ রায় হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তোষ প্রকাশ করছি। একইসঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। এ রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

রায়ে সংক্ষুব্ধ সাজাপ্রাপ্ত চঞ্চলের আইনজীবী, যাবেন আপিলে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক তরুণকে গুলী করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসামীপক্ষের আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন।

রায় ঘোষণার পর তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারের হয়ে আইনি লড়াই করেন।

আইনজীবী নিপ্পন বলেন, চঞ্চল চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে একটি এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন এসেছে। আমরা বারবার ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করেছি, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। অতএব আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। এ কারণেই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে যাবো।

তিনি বলেন, আমার ক্লায়েন্টের (চঞ্চল) কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। ১৯ জুলাই তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন সেন্টারে দায়িত্বে ছিলেন। সিডিআর-এ সেটি উল্লেখ রয়েছে। হঠাৎ একটি ভিডিওর ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। যা সমীচীন হয়নি বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ কারণেই আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন আসামীপক্ষের আরেক আইনজীবী আরশাদুল হক বাবুসহ অন্যান্য আইনজীবী।

ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার জন্য রিট করা হয়েছে: চিফ প্রসিকিউটর

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় করার জন্য রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায়ের পর তাৎক্ষণিক এক ব্রিফিংয়ে এমন মন্তব্য করেন চিফ প্রসিকিউটর।

এসময় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনটি ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও হেয় প্রতিপন্ন করার একটি প্রচেষ্টা।

তার অভিযোগ, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম এবং প্রসিকিউশন দলের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ট্রাইব্যুনালটি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বহু মামলার বিচার ও নিষ্পত্তি করেছে।

তার ভাষায়, ট্রাইব্যুনালে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে বিচার দ্রুত গতিতে আইন অনুযায়ী এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, যিনি এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তিনিও কিন্তু এর আগে এই ট্রাইব্যুনালের মামলায় অংশগ্রহণ করেছেন। তার দাবি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং কারও কারও ইন্ধনে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও বিষয়টি উত্থাপন করা হচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মহসিন রশিদ সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনটি জমা দেন।

রিট আবেদনে আইনটির কয়েকটি নির্দিষ্ট বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থি। সেই কারণেই এসব বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা বিচারিক পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।