ইবরাহীম খলিল
জুলাই আন্দোলনের ৫ নম্বর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মো. মাহিন সরকার জুলাইয়ের মূল্যায়ন করে বলেছেন, জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটা পার্ট। আমাদের কাছে এটি ইতিহাস হলেও ইতিহাসের দৃষ্টিকোন থেকে এটিকে ইতিহাস হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। জুলাইয়ে মূলত এমন একটি প্রজন্ম রাস্তায় নেমে এসেছিল; মুরব্বিরা তাদের ব্যাপারে বলতেন তোমাদের দিয়ে কিছু হবে না। এই প্রজন্মটি বেয়ারা টাইপের ছিল। মজার বিষয় হলো বেয়ারা হওয়ার কারণে তারা মা বাবার কথা না শুনেই রাস্তায় নেমে এসেছিল। সেই জায়গা থেকে এই প্রজন্মের জুলাইয়ের মাধ্যমে গল্প লিখেছে।
জুলাইকে মূল্যায়ন করতে হলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, এটি কিন্তু জেনারেশন জেড বা জেনজি। তাদের নিজস্ব একটি এখানে আছে। এই জুলাইয়ে একেকজন একেক জায়গা থেকে অংশ গ্রহণ করেছে। এখানে জুলাইকে এককভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। সবাইকে নিয়ে যখন গল্প বানাতে পারবো; সবার আকাক্সক্ষা ধারণ করতে পারি; তখনই জুলাইয়ের মূল্যায়ন হবে। আর এই আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে যদি সামনের দিনগুলো বিনির্মাণ করতে পারি। এর ইতিহাস হিসেবে যখন বিশ্লেষণ করবো, এরজন্য একটা মিনিমাম টাইমফ্রেম লাগবে। অন্তত ১০/১৫বছর বা এরও বেশি।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এখন যে প্রজন্ম রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, ধরেন তারেক রহমান। তিনি কিন্তু জেন জি না। তিনি ’৯০ সালের প্রজন্মের প্রতিনিধি। ’৯০ এর অভ্যুত্থানের সময় তিনি হয় ছাত্র নয়তো ছাত্রত্ব শেষ করেছেন। তিনি ’৯০ এর ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। সে হিসেবে আমি বলবো যে ’৯০ এর প্রজন্ম এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। আমি আমার জায়গা থেকে বলতে পারি, দুই বছরে জুলাই হয়তো ¤্রয়িমান হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি। এর অন্যতম কারণ হলো- ’৯০ সালের প্রজন্ম রাষ্ট্রটা পরিচালনা করছে এবং পলিসি লেবেলে জুলাই নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু জুলাইকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তারা যখন আগামী ১০ বছর বা ১৫ বছর পর রাষ্ট্রের পলিসি নির্ধারণ করবে তখন, যে যে দলেরই হউক না কেন; বিএনপি জামায়াত বা এনসিপি, তারা যখন ক্ষমতায় আসবে তখন জুলাইয়ের ছাপ দেখতে পাবো।
জুলাই থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই এমন প্রশ্নে জুলাই আন্দোলনের এই সমন্বয়ক বলেন, মানুষ বলে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। কিন্তু আমি মনে করি, ইতিহাস থেকে আসলে শিক্ষা নেয়। আমরা যেটাকে বলি একেবারে পরিবর্তন হয় না। সেটাও পরিবর্তন হয়। তবে রাষ্ট্রের যে কাঠামোগত পরিবর্তন আমরা চেয়েছিলাম সেটি আসলে হচ্ছে না। এখানেই আমাদের মূল উদ্বেগের জায়গা এবং বার বার রক্তক্ষরণ হয়, বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর অন্য দেশেও হয় এবং যারা স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাদের প্রত্যেকে যে কাঠামো বা আইন রেখেছে সবই উপনিবেশিক শাসনের আইন বা প্যানাল কোড। এই উপনিবেশিক আইন বা কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
পুলিশ বাহিনীর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বৃটিশরা পুলিশ বাহিনী কেন তৈরি করেছিল ? তাদের বেতন দিতো কিভাবে ? জোরপূর্বক তাদের আদায় করা অর্থ থেকে তাদের বেতন দেওয়া হতো। তো এখন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদি আপনি সেভাবেই রেখে দেন এবং তাদের এমন ধারণা দেন যে তোমার চাকরিটা চিরকালীন ভোগ করতে পারবে। এভাবে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের যদি ধারণা দেই যে, তোমাদের কোন শাস্তি নাই। এখানে একবার আসতে পারলে তুমি যা করবে তা-ই হালাল। এধরনের মানসিকতা-ই কিন্তু দিন শেষে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সূচনা করে। কাঠামোগত পরিবর্তন যতদিন না হবে; ততদিন পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ভয় থেকেই যাবে। আর এই কাঠামোগত পরিবর্তন হতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি আসলে থাকবে না। এর পরিবর্তন হবেই। এর কারণ হলো মানুষের যখন চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়, তখন ওই চিন্তাধারাকে ধারণ করে রাজনীতি করতে হয়। সেটা না করা হলে কোন একটা প্রজন্মের কাছে অপাংক্তেও হয়ে যাবে। এজন্য আমার বিশ^াস সংস্কার হবেই।
জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে মাহিন সরকার বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যেদিন আমাদের অনেক সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখন ইন্টারনেট শাটডাাউন ছিল। সেদিন আমার বাবা-মাকে না জানিয়েই ঢাকা এসেছিলেন এম্বুলেন্স ভাড়া করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যে আমাকে সাথে করে বাসায় নিয়ে যাবেন। আন্দোলনে আমার থাকা যাবে না। আমি জানিয়ে দেই যে আমি তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবো না। কারণ আমি যদি তোমাদের মুখ একবার দেখি তাহলে দুর্বল হয়ে যাবো। এর আরেকটি কারণ হলো তোমাদের কেউ অনুসরণ করে থাকতে পারে। তোমাদের সাথে দেখা হলে তোমাদের চোখের সামনে আমার ক্ষতি করতে পারে। এই দুই কারণে তোমাদের সাথে সাক্ষাণ করতে পারছি না। শেখ হাসিনাকে উৎখাত করে সফল হতে পারলে তোমাদের সাথে দেখা করবো। এজন্য তারা অনেক কান্নাকাটি করেছিল। বলেছিল যে তুই দূরে থাকবি আমরা তোকে দূরে থেকে দেখবো। এটাই বার বার মনে পরে।