সরদার ফরিদ আহমদ
বাংলাদেশের মানুষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নামেনি। তারা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। সেই সংস্কৃতি ছিল ক্ষমতার অহংকার, বিরোধীদের অবজ্ঞা, রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পদে পরিণত করা এবং জনগণকে রাজনৈতিক পরিচয়ে ভাগ করার সংস্কৃতি। জুলাইয়ের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মূল বার্তা ছিল একটাই-রাষ্ট্র কারও দলীয় সম্পত্তি নয়। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই শিক্ষা কি দ্রুত ভুলে যাওয়া হচ্ছে?
জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের বক্তব্য একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। তিনি অভিযোগ করেছেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ শুধুমাত্র সরকারি দলের আসনগুলোতে গেছে। বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এলাকায় যায়নি। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বৈষম্য নয়। এটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন।
দুর্যোগ কি দল দেখে আসে? বন্যা কি ব্যালট দেখে ঘরে ঢোকে? ঘূর্ণিঝড় কি সরকার ও বিরোধী দলের ভোটার আলাদা করে চিনতে পারে? যদি না পারে, তাহলে ত্রাণ বরাদ্দ কেন রাজনৈতিক পরিচয় দেখে হবে? সরকারের টাকা সরকারের নয়, জনগণের। করদাতার টাকায় কেনা এক কেজি চালের ওপর কোনো দলের প্রতীক থাকে না। একজন বিরোধী দলের ভোটারও সমান কর দেন। সমান নাগরিক। সমান অধিকার তারও আছে।
গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হলো রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র যখন দলীয় হয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো বিরোধী দলের নির্বাচিত আসনগুলোতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী এমপিদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত। এখানে প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন তদারকি করবেন কে? জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি, নাকি অন্য দলের মনোনীত প্রতিনিধি?
যদি জনগণ কোনো এলাকায় জামায়াত, এনসিপি, খেলাফত মজলিস বা অন্য কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়ে থাকে, তাহলে সেই এলাকার রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব মূলত সেই নির্বাচিত প্রতিনিধির। কিন্তু যদি সরকার মনে করে নির্বাচিত প্রতিনিধি যথেষ্ট নয়, তাই সরকারদলীয় আরেকজনকে পাঠাতে হবে, তাহলে জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান কোথায়?
এতে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়। বার্তাটি হলো-নির্বাচনে জিতলেও তোমরা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নও। গণতন্ত্রে এই মানসিকতা শুভ নয়। ইতিহাস বলে, স্বৈরাচার কখনও একদিনে জন্ম নেয় না। ধীরে ধীরে জন্ম নেয়। ছোট ছোট অজুহাতে জন্ম নেয়। প্রথমে বলা হয়, ‘এটা তো সামান্য বিষয়।’তারপর বলা হয়, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজন।’ এরপর বলা হয়, ‘বিরোধীদের ওপর ভরসা করা যায় না।’একসময় দেখা যায় রাষ্ট্র ও দল একই জিনিস হয়ে গেছে।
জার্মান-আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট লিখেছিলেন, সর্বগ্রাসী শাসনের আদর্শ নাগরিক সে নয় যে অন্ধভাবে মতাদর্শে বিশ্বাস করে; বরং সে, যার কাছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বিলীন হয়ে যায়। তিনি সতর্ক করেছিলেন, যখন ক্ষমতা সত্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হতে শুরু করে। ইতালীয় চিন্তাবিদ উমবার্তো ইকো তার বিখ্যাত ‘Ur-Fascism’ প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন, ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি একটি মানসিকতা। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখা, ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা এবং রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতিয়ার বানানো।
বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবাণী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা খুব দূরের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছি না। আমরা মাত্র দুই বছর আগের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছি। মানুষ এখনো জুলাইয়ের নিহতদের ছবি ভুলে যায়নি। মানুষ এখনো গুলীর শব্দ ভুলে যায়নি। মানুষ এখনো নিখোঁজ, গুম, মামলা, দমন-পীড়নের স্মৃতি ভুলে যায়নি। যে কারণে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই একই কারণে যদি আবার ক্ষোভ জমতে শুরু করে, তাহলে সেটি কারও জন্য শুভ হবে না।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়। আত্মসংযম। আইনের শাসন। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা। বিজয়ীর উদারতা। বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী দলে ছিল। তারা বৈষম্যের অভিযোগ করেছে। রাষ্ট্রীয় হয়রানির অভিযোগ করেছে। প্রশাসনের দলীয়করণের অভিযোগ করেছে। আজ ক্ষমতায় এসে যদি একই অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে ওঠে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে তাদেরই। কারণ জনগণ প্রতিশোধের রাজনীতি চায়নি। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা রয়েছে। তারা কি রাষ্ট্রকে দলের ওপরে রাখবে? নাকি দলকে রাষ্ট্রের ওপরে বসাবে? তারা কি বিরোধী দলের ভোটারকেও সমান নাগরিক মনে করবে? নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করবে?
জুলাইয়ের রক্তের প্রতি সম্মান দেখাতে হলে উত্তর একটাই। রাষ্ট্রকে অবশ্যই সবার হতে হবে। নয়তো ইতিহাস আবারও নির্মম হবে। বাংলাদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা অনেক কিছু সহ্য করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক ঔদ্ধত্য সহ্য করে না।
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো-এটি চিরস্থায়ী মনে হওয়া। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস সেই বিভ্রমের কবরস্থান।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন