প্রফেসর আর. কে. শাব্বীর আহমদ

ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান নেই বলে অনেকে রাজনীতি থেকে ইসলামকে আলাদা করে দেখে। মনে করে ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম। হিন্দু ধর্মে নানা পর্বে কিছু পূজা-অর্চনা হয়। খৃস্টান, বৌদ্ধ ধর্মে গীর্জা, পেগোডাকেন্দ্রিক সপ্তাহে বা বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে বিশেষ উপাসনা করা হয়, নিরামিষ খাওয়া ও মাঝে মাঝে উপবাসব্রত পালন করা হয়। এসব ধর্মে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনো বিধি-বিধান নেই। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিধি-বিধানে তারা মানবরচিত আইন বা কোনো পরাশক্তির রাষ্ট্রীয় আইনের অনুসরণ করে। ধর্মকে তারা নৈতিক বা সার্বজনীন কল্যাণে ব্যবহার করে না। এটা তাদের মূর্খতা বা স্বেচ্ছাচারী জীবনের মোহের কারণ হতে পারে। ইসলামকেও তারা একান্ত ব্যক্তিগত ও ঐচ্ছিক বিষয় মনে করে কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সার্বিক কল্যাণের বিধান হিসেবে পালন করে না। তারা মসজিদ, মাদরাসা বা হুজরাখানায় ইসলামকে আবদ্ধ করে রাখে। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধানকে তারা সংকুচিত করে রাখে।

ইসলামে যে জীবন যাপনের সর্ব দিকের দিকনির্দেশনা আছে, তা তারা নিজেদের অজ্ঞতা, স্বার্থান্ধতা বা অপরাধ ঢাকার হীন উদ্দেশ্যে এড়িয়ে চলে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা নীতিহীন ও স্বৈরাচারী চরিত্রের মানুষের হাতে চলে যায়। অথচ আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই পৃথিবীর রাজত্ব পরিচালনা করবে আমার সৎকর্মশীল বান্দারা।” -সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত : ১০৫

কুরআনে যাবতীয় বস্তু ও বিষয়ের পরিচয় ও সমাধানের কথা আল্লাহ তা’আলা এভাবে বলেছেন : “আমি এই কিতাব আপনার প্রতি নাযিল করেছি যা সব বস্তু ও বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে এবং যা সঠিক পথ নির্দেশনা, রহমত ও সুসংবাদ প্রদান করে তাদের জন্য, যারা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শির নত করে দিয়েছে।” -সূরা আন নাহল, আয়াত : ৮৯

আল্লাহ তা’আলা আরো ঘোষণা করেন : “আর যমীনে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণী এবং দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মতো এক একটি উম্মত। আমি কিতাবে কোনো কিছুর বর্ণনা বাকি রাখিনি। অতঃপর তাদেরকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।” -সূরা আল আন’আম, আয়াত : ৩৮

এ সব আয়াতে বোঝা যায় আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনে অন্ন-বস্ত্রসহ যাবতীয় বস্তু, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রতিটি বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ সমাধান বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’লার সৃষ্ট মানুষেরা সে মোতাবেক তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করবে।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম : ইসলামকে একটি পরিপূর্ণ দীন বা জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মনোনীত দীন বা পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থার নাম আল ইসলাম।” -সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯

ইসলাম শুধু মসজিদ, মাদরাসা, খানকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসলামি জীবন বিধান ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠত হবে। যেভাবে রাসূল সা. ব্যক্তিকে আল্লাহর অনুগত গোলামে পরিণত করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আল্লাহর আইন অনুযায়ী পরিচালনা করে মানবতার মুক্তি সাধন করেছেন। যার বাস্তব নজির মদিনায় প্রতিষ্ঠিত কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা। যে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম চর্চা : আমাদের দেশে এক শ্রেণির মুসলমানকে দেখা যায়, মসজিদে মসজিদে ঘুরে ঘুরে মানুষকে শুধু নামাযের দিকে দাওয়াত দেন এবং কিছু ফাজায়েলে আমলের কিতাব পড়ে শোনান। ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সেটা বাস্তবায়নের কোনো চিন্তা তাদের মাথায় নেই। সমাজ যে অসৎ, নাস্তিক ও কাফির-মুশরিকদের তাবেদারদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং ইসলামের বিধিনিষেধ উপেক্ষিত হচ্ছে, সেদিকে তাদের দৃষ্টি নেই। তারা ইসলামের প্রাথমিক কিছু কাজ- সূরা, কিরাত সহীহ করা ও নামায-রোযার মতো ব্যক্তিগত আমলের তা’লিম দিচ্ছে ভালো কথা, কিন্তু নামাজীদের দ্বারা সমাজ পরিচালনার পরিকল্পনা তাদের নেই। এমনকি যারা ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি ইসলামের বিধানকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করছে, তাদেরকে নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে সৎ ও যোগ্য লোকের নেতৃত্বে ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি আন্তরিক ও কার্যকরী সমর্থনও তারা দিচ্ছেন না।

পীর-মুরিদীর চর্চা : কিছু হক্কানী পীর ছাড়া বেশিরভাগ পীরেরা মুরিদদেরকে ইবাদতের নামে বিদ’আতি কিছু যিকির আযকারে লিপ্ত রাখেন, নবী সাহাবাগণের যিকির-আযকারের সাথে যার কোনো সামঞ্জস্য নেই। তারা নযর, মানত পূরণের কথা বলে মুরিদদের কাছ থেকে হাদিয়া তোহফা গ্রহণ করেন। এক শ্রেণি আছে নযর, মানত পূরণের উদ্দেশ্যে মাজারেও অর্থ কড়ি দান করে।

তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের স্বেচ্ছাচারিতা : আরেক শ্রেণির তথাকথিত বুদ্ধিজীবীখ্যাত মানুষ আছে, যারা ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা জেনেও নিজেদের স্বেচ্ছাচারী জীবন উপভোগ করার জন্য ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অন্তরায় মনে করে। এদের মধ্যে অনেকে নাস্তিকদের ও মুসলিম বিরোধী পরাশক্তির এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। তারা চরিত্র বিধ্বংসী নাস্তিক্যবাদী শিক্ষানীতি ও সমাজনীতি বাস্তবায়নে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তথাকথিত নারীবাদীদের সংস্কারমালা পেশ তার নিকৃষ্ট উদাহরণ। তারা পিতার সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান বণ্টন চায়, যা সম্পূর্ণ কুরআন বিরোধী সুপারিশ। আলকুরআন নারীদের মর্যাদা সমুন্নত করেছে মানুষ হিসেবে ও অর্থনৈতিকভাবে। নারীরা পিতার সম্পদে অংশ পায়, স্বামীর সম্পদে অংশ পায়। ভাইয়ের সন্তান না থাকলে সে সম্পদেও নারীরা অংশ পায়। বিয়ের সময় নারীরা স্বামীর পক্ষ থেকে দেনমোহর হিসেবে সম্মানজনক অর্থ ও স্বর্ণ অলংকার প্রাপ্ত হয়। যা পুরুষরা পায় না। এতে করে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়। পিতার অবর্তমানে নারীরা ভাইদের বাড়িতে বেড়াতে যায়। স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপন করে। আবার কোনো নারী বিধবা হলে ভাইয়েরা তার দায়িত্ব পালন করে। পুরুষরা তাদের পিতা-মাতাকে মৃত্যু পর্যন্ত লালন পালন করে। তাদের পেছনে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করে। যা নারীদের করতে হয় না। এজন্য ইসলাম পুরুষদেরকে পিতার সম্পত্তিতে নারীর দ্বিগুণ অংশ ধার্য করেছে। এটা সাম্য ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টন। এতে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না বরং তাদের মর্যাদা ও রক্ত সম্পর্ককে আরো মজবুত, আরো সমুন্নত করে। তাছাড়া নারীদের কোনো ব্যক্তিগত আয় উপার্জনে তাদের স্বামীদের বা শ্বশুর পক্ষের কোনো অধিকার নেই। নারীরা তার উপার্জনের একক মালিকানার অধিকারী। এতেও নারীদের স্বতন্ত্র মর্যাদা সংরক্ষিত হয়। এ মর্যাদা একমাত্র ইসলামই দিয়েছে। নারীবাদীরা বেশ্যাবৃত্তিকে সমর্থন করে এবং সেই নিকৃষ্ট নারীদেরকে যৌনকর্মী হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়ার সুপারিশ করে, যা অত্যন্ত ঘৃণিত, মানবতাবিরোধী এবং ইসলাম বিরোধী। ইসলাম সব শ্রেণির মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে এবং তাদেরকে মান-সম্মত কর্মসংস্থানের জন্য উৎসাহিত করে। কিন্তু নারীবাদীরা একটি চরিত্র বিধ্বংসী বিকৃত রুচির পেশাকে সমর্থন দেয়, যা কোনো সভ্যসমাজ বা কোনো ধর্মে গ্রহণযোগ্য নয়। যিনা ব্যভিচার ইসলামে নিষিদ্ধ যা সমাজকে কলুষিত করে এবং ব্যক্তি চরিত্রকে ধ্বংস করে। আল্লাহ তা’আলা আল-কোরআনে ঘোষণা করেন : “তোমারা যিনা-ব্যভিচারের কাছেও যেওনা, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ।” -সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ৩২

রাজনীতিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব : আরেক শ্রেণির মানুষ আছে যারা ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে রাজনীতিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে না। প্রকৃত সাম্যের বিধান হচ্ছে, রাজ্যের বিচার ফায়সালা চলবে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেন : “যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না তারা অস্বীকারকারী কাফির।” -সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত : ৪৪

আল্লাহ তাআলা আরও ঘোষণা করেন : “শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই।” -সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪০

“জেনে রাখো সৃষ্টি তাঁরই এবং নির্দেশও তাঁরই।” -সূরা আল আ’রাফ, আয়াত : ৫৪

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামও জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করার গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর ভাষায় : “হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে একথা বলতে শুনেছি, যে জাতির মধ্যে কোনো ব্যক্তি পাপ কাজ করতে থাকে আর সে জাতির কর্তৃত্বশীল লোকেরা তার পাপ কাজ করার পথ বন্ধ করে দিতে সমর্থ হয়েও যদি তা না করে তবে আল্লাহ তা’আলা নিশ্চিতই মৃত্যুর পূর্বে তাদের ওপর এক কঠিন বিপদ ও আযাব চাপিয়ে দেবেন।” - আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৩৮

এ কথা বাস্তব সত্য যে, তথাকথিত রাজনীতিকরা ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে চায় সেক্যুলার ও নাস্তিক্যতাবাদীদের এজেন্ট হিসেবে এ দেশ থেকে ইসলামি মূল্যবোধকে বিনাশ করার জন্য।

ইসলামী অর্থনীতি : ইসলামে শোষণমুক্ত অর্থনীতি চালু করা হয়েছে। জড়বাদী অর্থনীতিকদের মতো ইসলাম মানুষকে অর্থনৈতিক জীব হিসেবে নয় বরং মানুষ হিসেবে তাদের জৈবিক চাহিদা, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা ও আবেগ অনুভূতি পূরণ করার সাথে সাথে তার ব্যক্তি সত্তাকে মৌলিক গুরুত্ব দিয়ে এক নিপুণ অর্থব্যবস্থা চালু করেছে। সম্পদ অর্জন মানুষের নিজস্ব কোনো কর্তৃত্ব নয় এটি একমাত্র আল্লাহর রহমত ও বদৌলতে মানুষকে দান করা হয়েছে। এজন্য আল্লাহ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন : “তিনি যে সম্পদে তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন সে সম্পদ থেকে খরচ করো।” -সূরা আল হাদিদ, আয়াত : ৭। ইসলামে মওজুদদারীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলার ঘোষণা : “যারা সোনা রুপা জমা করে রাখে আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না তাদেরকে পীড়াদায়ক কঠিন আযাবের সুসংবাদ দাও।”-সূরা আত তাওবা, আয়াত : ৩৪

আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনে সুদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার ঘোষণা করেছেন : “আল্লাহ বেচা-কেনাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” -সূরা আল বাকারা, আয়াত : ২৭৫

এভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আল্লাহ তা’আলা মানুষের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা আল ইসলামকে রাসূলের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। ইসলামের পূর্ণ অনুসরণেই মানবতার মুক্তি ও সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। যারা ইসলামের বিরোধিতা করে তারা মূলত নাস্তিক্যতাবাদীদের দালাল ও দোসর হিসেবে কাজ করছে। যারা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এবং অজ্ঞতাবশত ইসলামের বিরোধিতা করে তারা মূলত শয়তানের অনুসারী।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশে একটি কল্যাণধর্মী ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথকে সুগম করে দিন এবং একদল সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি মানবিক ও সর্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তাওফিক দান করুন।

লেখক : শিক্ষাবিদ, কবি ও গীতিকার