সাংবিধানিকভাবে ভারত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলো দেশটির রাজনীতিতে উগ্রবাদের উত্থান পুরো চিত্রকেই পাল্টে দিয়েছে। সঙ্গত কারণে আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশটি নিজস্ব স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। বিঘ্নিত হচ্ছে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় চরিত্র। ক্রমেই এ অবস্থার আরো অবনতি ঘটছে। এক্ষেত্রে উগ্রবাদীদের প্রধান টার্গেট হলো সে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর (এইচআরডব্লিউ) অভিযোগ, ভারত সরকার দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘুদের সাথে কৌশলে বৈষম্যেমূলক আচরণ করছে। নয়াদিলীøতে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার প্রথম বার্ষিকীর অল্প কিছুদিন আগেই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। গত ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক সহিংস ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৪০ জন মুসলমান। বিষয়টিকে ভাল চোখে দেখেনি আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল।
মূলত, ২০১৯ সালে বিতর্কিত ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) প্রণয়নের জেরে দেশটিতে বিক্ষোভ শুরুর পর রাজধানীতে ওই সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই আইন অনুসারে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে অভিবাসন করে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈনসহ অন্য সংখ্যালঘুদের দেশটির নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ দেয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে দিলীøর দাঙ্গা প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘বিজেপি নেতাদের সহিংসতায় উস্কানি ও হামলায় পুলিশ সদস্যদের অংশগ্রহণের অভিযোগ সত্ত্বেও কোনো প্রকার বিশ্বাসযোগ্য ও পক্ষপাতহীন তদন্তের পরিবর্তে অ্যাকটিভিস্ট ও বিক্ষোভ সংগঠনকারীদের নিশানা বানিয়ে নেয় কর্তৃপক্ষ।’ এতে আরো বলা হয়, ‘কর্তৃপক্ষ এবারের কৃষকদের গণবিক্ষোভেও দেরিতে সাড়া দিয়েছে। শিখ সংখ্যালঘু বিক্ষোভকারীদের ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সাথে তাদের কথিত সম্পর্কের বিষয়ে তদন্তের সূচনা করে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে সহিংস উগ্রবাদের প্রসার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বৈষম্যকে আইনি বৈধতা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ‘এ পদক্ষেপ দেশীয় আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে চলতে ভারতের বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন করেছে, যাতে বর্ণ, জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্যকে নিষেধ করে এবং সরকারের কাছে সব নাগরিকের আইনের অধীনে সমান নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি করে।’ এতে আরো বলা হয়, ভারত সরকার ধর্মীয় ও অন্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেয়ায় এবং তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতা ছড়াতে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ ও ন্যায্যভাবে বিচারের আওতায় আনতে দায়বদ্ধ। অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উইম্যানস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি কবিতা কৃষ্ণন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ভারতে যা হচ্ছে, এটি তার স্বীকারোক্তি। তার ভাষায়, আগামীতে এ বৈষম্য আরো বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্ট এ প্রচারণায় দিনে দিনে মুসলিম, খ্রিস্টান ও শিখদের আক্রমণের নিশানা করা হবে। যা খুবই বাস্তবসম্মত অভিযোগ বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল।
মূলত, ভারতে মুসলমানদের অধিকার ক্রমেই সীমিত করা হচ্ছে। ভারত যখন স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদ্যাপন করছে, তখন দেশটির মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুরা নিজেদের অবরুদ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করছেন। ২০১৪ সাল থেকে ভারত শাসন করছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নরেন্দ্র মোদির অধীন ভারত ক্রমাগত ডানপন্থার দিকে এগোচ্ছে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। প্রকাশ্যে ও সুসংগঠিতভাবেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী এজেন্ডাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তা মুসলমানদের হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিকভাবে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। কাতারের সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় এ নিয়ে বিশ্লেষণ লিখেছেন দিলীøভিত্তিক সাংবাদিক বলয় সিং। মোদি সরকারের অধীন মুসলমানরা যে ক্রমেই সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও বয়কটের শিকার হচ্ছেন, তার এ প্রতিবেদনে তা-ই উঠে এসেছে। সমালোচকরা বলছেন, মোদির অধীন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। দেশকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণা করতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের দাবি দিন দিন জোরদার হচ্ছে। বড় ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘুরা; বিশেষ করে মুসলমানরা। বাদ যাননি নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও।
বস্তুত, ভারত জুড়ে মুসলমানেরা স্থূল ও সূক্ষ্ম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। মোদির বিজেপি সমর্থিত ডানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে অব্যাহত বৈষম্য করে যাচ্ছে। মুসলমানদের পোশাক, ইবাদতের জায়গা, ধর্ম প্রচার ও চর্চার সাংবিধানিক অধিকার সব কিছুতে হামলা চলছে, নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। মুসলমানদের অধিকারগুলো ছোট হয়ে আসছে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুসলমানদের ওপর খড়গ নেমে এসেছে। আর এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না।
ভারতীয় পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন দলের কোনো মুসলিম প্রতিনিধি নেই। লেখক ও সাংবাদিক ধীরেন্দ্র কে ঝা বলেছেল, যদি হিন্দু রাষ্ট্রের অর্থ এমন হয় যে, মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, তাহলে এরইমধ্যে ভারতে তা কার্যকর হয়ে গেছে। এখানে মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তগুলো সমানে ভারত রাষ্ট্রের ধরনে পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। ২০১৮ সালে তিন তালাক বাতিল করে একটি আইন পাস করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এরইমধ্যে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘লাভ জিহাদ’ আইন পাস করা হয়েছে। এতে বিয়ের মধ্য দিয়ে ধর্মান্তকরণকে অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে মোদি সরকার। এতে প্রতিবেশী দেশগুলোর অমুসলিম সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেয়ার অনুমোদন দেয়া হয়। এসব আইন পাসের ঘটনায় নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়েছে। এমনকি রাজধানী নয়াদিলীøতে দাঙ্গায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্ণাটকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করেছে সেখানকার বিজেপি সরকার। ২০২১ সালে মাদরাসা বিলুপ্ত করে আইন পাস করেছে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম। গত সপ্তাহে মোদির আসন বারণসীতে ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ ৩২ পাতার খসড়া সংবিধান প্রকাশ করা হয়েছে। ডানপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলোর এই সংবিধানে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের ভোটাধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। অ্যাকটিভিস্ট খালিক মনে করেন, হিন্দু রাষ্ট্র নিয়ে যে কথা উঠেছে, তা কেবল অন্যায় ও নৃশংসতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা হতে পারে। যাতে মুসলমানসহ অহিন্দুদের অস্বীকার করা হবে। হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের ভিত্তিভূমি অযোধ্যার জোড়া শহর ফাইজাবাদে বসবাস খালিক খানের। তিনি দাবি করেছেন, মুসলমানদের ক্ষমতাশূন্য ও মনোবল নষ্ট করে দেয়া এবং সামাজিকভাবে হীন করতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মূলত, ১৯৯০-এর দশকে ধর্মীয় আন্দোলনের ফলে বিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ে। ওই আন্দোলনের কারণে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে মেরুকরণ ঘটে। মুসলমানদের হানাদার ও বহিরাগত হিসেবে আাখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯২ সালে উত্তরপ্রদেশের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দিতে হিন্দু জনতাকে অনুমতি দেয় তখনকার বিজেপি সরকার। অযোধ্যায় ষোড়শ শতকের ওই অবকাঠামো ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। কারণ তাদের বিশ্বাস মসজিদটি এমন জায়গায় নির্মিত, যেখানে হিন্দু দেবতা রামের জন্ম হয়েছিল। একইভাবে উগ্রবাদীরা এখন মুঘল স্থাপত্য তাজমহল ও জ্ঞানবাপী মসজিদকে বিশেষভাবে টার্গেট করেছে।
২০১৯ সালে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যদিও মসজিদের আগে সেখানে কোনো মন্দির থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে শীর্ষ আদালত স্বীকার করেছে। সেখান থেকে ১৬ মাইল দূরে মসজিদ নির্মাণে মুসলমানদেরও একটি জমি দেয়া হয়। আদালতের রায়ের মাস ছয়েক পর হিন্দু ধর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মোদি। তখন ভারতের সরকারি ও বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে তা সরাসরি প্রচার করা হয়। এরপর আরও সাত বছর অতিক্রান্ত হলেও মসজিদ নির্মাণের কোনো খবর নেই। সরকারি লাল ফিতায় আটকে আছে মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হওয়ার পর ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যায় উপমহাদেশ। তাড়াহুড়ো করা সীমান্ত রেখা টেনে দেয়ার পর দেশভাগের সময় প্রায় ২০ লাখ মানুষ নিহত হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত হন দেড় কোটি। এম কে গান্ধী ও প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর অধীন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বাতিঘর হিসেবে ভারতের জন্ম হয়। একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র যেখানে সব মত, পথ ও ধর্মের মানুষের সমান স্বাধীনতার কথা বলা হয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার চার মাস পর ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে এম কে গান্ধীকে হত্যা করা হয়। হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদে বিশ্বাসী এক গুপ্তঘাতক তাকে হত্যা করে। অবিভক্ত ভারতকে ব্যবচ্ছেদের জন্য গান্ধী ও নেহেরুর কংগ্রেস দলকে দায়ী করে আসছে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) রাজনৈতিক শাখা বিজেপি। ইউরোপীয় নাৎসিবাদের অনুসরণে ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরএসএস। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় উগ্র-ডানপন্থী এই আধাসামরিক সংস্থাটি। এটির লাখ-লাখ আজীবন সদস্য রয়েছে।
বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি আরএসএস। এছাড়াও দেশ ও দেশের বাইরে আরও কয়েক ডজন হিন্দু ডানপন্থি গোষ্ঠী আছে। তারা ‘এক দেশ, এক জাতি, এক সংস্কৃতির’ ধারণায় বিশ্বাস করে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগবতের ভাষায়, একই মাটির সন্তান হিসেবে পরস্পরের মধ্যে সাদৃশ্য বুঝতে পারা, ভিন্নমতকে সম্মান দেয়া, স্বার্থপরতা থেকে বেরিয়ে আসা, বৈষম্য এড়িয়ে চলা এবং সবার আগে দেশ বর্তমান সময়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে এসব মাথায় রাখতে হবে। মুসলমানদের নিয়ে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন ২০ শতকের শুরুর দিকে আরএসএস মতাদর্শের প্রবক্তা বিনায়ক দামোদর সাভারকর। তিনি বলেন, যদিও মুসলমানদের পিতৃভূমি হিন্দুস্থান, তবুও এটা তাদের পবিত্রভূমি নয়। তাদের পবিত্রভূমি সুদূর আরব ও ফিলিস্তিনে।
মোদির ভারতে মুসলমানদের প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। তাদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বর্জন করা হচ্ছে। গেল ৭৫ বছরে ভারতে ঘুড়ি উড়িয়ে ১৫ আগস্ট উদ্যাপন করা হতো। যা ছিল ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সূক্ষ্ম প্রতীক। কিন্তু সম্প্রতি ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ প্রচারের মাধ্যমে ভারতে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করা হচ্ছে। হর ঘর তেরঙ্গা বলতে দেশের প্রতিটি ভবন ও বাড়িতে পতাকা উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপাত্র শারদ শর্মা বলেন, আমরা মনে করি, যারা হর ঘর তেরঙ্গা কর্মসূচিতে অংশ নেবে না, তারা দেশবিরোধী। তারা হলো তাদেরই প্রেতাত্মা, যারা ভারত ভাঙতে চায়। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা উচিত। তিনি আরও বলেছেন, ‘কারও ভয় পাওয়া উচিত না। যারা ভীত, তাদের ওপর সম্ভবত পাকিস্তান ও রোমের প্রভাব পড়েছে। আমি মনে করি না, ভারতে কোনো ভয় আছে’। কিন্তু ভারতীয় কবি ও শিক্ষাবিদ সাবিকা আব্বাস নকভী বলেন, ‘এখানে মুসলমানদের ভয় পাওয়ার বহু কারণ আছে। হিন্দু রাষ্ট্রের সঙ্গে ভয়ের সংমিশ্রণ আছে। আমার মনে হচ্ছে, আমরা সবাই মিলে যে স্বপ্নকে গড়ে তুলেছিলাম, তার ওপর আঘাত হলো এই হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা’। তিনি আরও বলেন, ‘একজন মুসলমান নারী হিসেবে আমার পরিচয় ঝুঁকিতে। আমাদের লাশ, আমাদের জীবন ও স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন ভারত গড়ে তোলা হচ্ছে। আমাদের শঙ্কা আমরা এমন একটি জাতি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছি, যেখানে সাংবিধানিকভাবে আমাদের একীভূত করা হয়েছিল’।
বিগত দশকে ভারতের জাতীয় প্রতীকের একটি আগ্রাসী সংস্করণ উন্মুক্ত করেছেন নরেন্দ্র মোদি। নির্মাণাধীন নতুন পার্লামেন্ট ভবনের ওপর একটি হিংগ্র সিংহের গর্জনের এই ভাস্কর্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেরও খবর হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় ভাস্কর্যের সঙ্গে মিল রেখে এই প্রতীক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা দাবি করেন, প্রাচীন ভাস্কর্যের চেয়ে এই সিংহের মূর্তি আরও হিংস্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।
চলচ্চিত্র পরিচালক সাঈদ মির্জা বলেন, বড় পরিসরে দেখলে, জাতভিত্তিক পার্থক্য ও ব্রাহ্মণীয় আধিপত্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে হিন্দুজাতীয়তাবাদের মুখোশে আড়াল করে দেয়া হয়েছে। জাতীয় প্রতীকের এই রূপান্তরকে সহনশীল লোকাচার ও বহুত্ববাদ থেকে উগ্র ও ঘৃণায়পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন ভারতীয়দের অনেকেই।
হায়দারাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক তানভীর ফজল বলেন, এখানকার মুসলমানরা একই জাতীয় না, কিন্তু ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও নির্যাতনের মুখে তারা ঐক্যবদ্ধ। সর্বত্রই তাদের প্রথম উদ্বেগ হলো, জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা। আর গরিব মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তার ভাষায়, ভারতীয়রা যদি এই ধর্মীয় মেরুকরণ বন্ধ না করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে মুসলমনরা অবরুদ্ধ অবস্থায় থেকে যাবেন’। যা কোন গণতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট হতে পারে না।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। সরকার গঠনের পরই তারা নতুন মাত্রায় মুসলিম নিগ্রহ শুরু করেছে। উগ্রবাদীরা মুসলিম নাগরিকদের জয়শ্রীরাম বলতে বাধ্য করছে। গরু কুরবানীর ওপর দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ইতোমধ্যেই কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মূলত, পশ্চিম বঙ্গে মুসলমানদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। উগ্রবাদীরা শুধু মুসলমানদের সাথেই বৈষম্যমূলক আচরণ করছে না বরং বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে করা হচ্ছে একই আচরণ। যা কোন গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, ভারত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের আড়ালে একটি ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। দেশটিতে মুসলমানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুরা রীতিমত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। মূলত, বিশাল ভূখণ্ড ও নানা ধর্ম ও বোধ-বিশ্বাসের মানুষের বসবাস প্রতিবেশী দেশ ভারতে। তাই এই বিশাল রাষ্ট্রকে অখণ্ড ও রাখতে হলে সকল ধর্ম, মত ও পথের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই দেশের শাসনকাজ আবর্তিত হওয়া দরকার। অন্যথায় জাতীয় অনৈক্য দেশটির জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। এর বাস্তব নমূনা হচ্ছে সাম্প্রতিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনের তীব্রতা।
www.syedmasud.com