মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী
বাংলাদেশে পরিবেশ উন্নয়নের নামে সাড়া বছর বৃক্ষরোপণ করা হলেও এতে কোন কাজ হয় না। অথচ পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণের কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার বৃক্ষরোপণের ওপর বেশ জোড় দিলেও এর বাস্তব সফলতা কতটুকু এনে দিবে সেটাই প্রশ্ন। শুধু একদিন গাছ লাগিয়ে কি পরিবেশ রক্ষা সম্ভব? যখন বছরের বাকি সময় জুড়ে হাজার হাজার একর বনভূমি উন্নয়নের নামে উজাড় হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে জনমত সৃষ্টি ও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন নতুন রাস্তা, রেলপথ, বিমান বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও আধুনিক শহরের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। প্রকৃতির একটা নিজস্ব নিয়ম আছে নিজেকে রক্ষা করার। এ নিয়মের যদি কোন ব্যাঘাত ঘটে তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্ন্নিত হয়। যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে প্রাকৃতিক সম্পদের বিভিন্ন অপব্যবহারের দরুন আজ পরিবেশ মানুষের আবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে দ্রুত শিল্পায়ন প্রক্রিয়া যেমন দায়ী তেমনি ততোধিকভাবে দায়ী নির্বিচারে সবুজ বৃক্ষরাজির ধ্বংস সাধন। এমনিভাবে যানবাহনের নির্গত কালো ধোঁয়া, বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার, বিষাক্ত আণবিক বর্জ্য জ¦ালানির তেজস্ক্রিয়তা প্রভৃতি একইভাবে পরিবেশ দূষিত করে চলছে। কিন্তু উন্নয়ন যদি প্রকৃতির বিনিময়ে হয়, তবে সে উন্নয়ন কতটা টেকসই সেই প্রশ্ন আজ আরও জোরালো হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নদী ভাঙনে, রেললাইন সম্প্রসারণ নতুন নতুন জাতীয় সড়ক নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্য বনভূমি ও হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে এটা দুঃখজনক। এখন আবার রাজধানীর বাইরে যেমন লালমনিরহাট, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় বিমানবন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশাল বনভূমি বা গাছ কেটে ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে বন সংরক্ষণের দায়িত্বে যারা আছেন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় তারাই বন উজাড় করার কাজে লিপ্ত। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জনমত গ্রহণ এবং জীববৈচিত্র্যের দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতির বিষয়গুলো অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়।
বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়। বন হলো জন্মবায়ুর নিয়ন্ত্রক, বৃষ্টির উৎস, হাজারো প্রাণীর আবাসস্থল এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি। একটি শতবর্ষী বন কেটে সেখানে কয়েক হাজার চারা গাছ লাগিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বন সৃষ্টি হয় দশক ও শতাব্দী ধরে, এটি কোন প্রকৌশল প্রকল্প নয় যা কয়েক মাসে পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব। আজ যখন সাড়া বাংলাদেশ তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষা, পানির সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুভব করছে, তখন বনসম্পদ ধ্বংশের প্রবণতা আরো বিপদজনক। বলে রাখা ভাল, পরিবেশকে দুর্বল করে উন্নয়নের যে কোন মডেল তৈরী করা হয় তা সাধারণত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত ও বিপদজনক উত্তরাধিকার রেখে যাবে। শুধু বিশ্ব পরিবেশ দিবসের দিন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শুধুমাত্র গাছ লাগানোর ছবি পত্র-পত্রিকায় বা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিবেশ দূষণ রোধে দ্রুত বনায়নের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ একথা অনস্বীকার্য। কারণ একটি দেশের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানব বসতির উপযোগ্য রাখতে হলে দেশের মোট ভূখণ্ডের চার ভাগের এক ভাগ বন-বনানী থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রকৃত পরিবেশবাদ হচ্ছে বিদ্যমান বন রক্ষা করা, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে পরিবেশগতভাবে জবাবদিহিতামূলক করা এবং বনভূমিকে কেবল খালি জমি হিসেবে দেখার মনমানসিকতা পরিবর্তন করা। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু এমন উন্নয়ন প্রয়োজন, যা প্রকৃতিকে ধ্বংশ করে নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে এগিয়ে যায়। অন্যথায় একদিন হয়তো আধুনিক শহর, বন্দর ও মহাসড়ক পাবো ঠিকই তবে হারিয়ে ফেলবো সেই বনভূমি যার ওপর আমাদের অস্তিত্বই নির্ভরশীল। আমাদের সে সতর্কবার্তাই আবার স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতির বিরুদ্ধে কোন উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের পক্ষে নয়। তাই, আগামী প্রজন্মকে একটি সবুজ ও স্বাস্থ্য-উজ্জ¦ল দেশ তথা পৃথিবী উপহার দিতে হলে আমাদের সকলকে “উন্নত বন হোক উন্নত মন” এ শ্লোগান নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তাহলেই হয়তো এ দেশ, এ পৃথিবী একসময় সবুজ ও স্বাস্থ্য-উজ্জ¦ল হয়ে উঠবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলাম লেখক।