বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে অবৈধভাবে ম্যাচ সম্প্রচারকারী হাজারো পাইরেটেড ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান চালিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক এ অভিযানে ব্রাজিলের ৩০৯টি ওয়েবসাইটসহ বিশ্বজুড়ে দুই হাজারেরও বেশি ডোমেইন জব্দ করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অভিযানে লক্ষ্যবস্তু হওয়া ওয়েবসাইটগুলো বৈধ সম্প্রচারস্বত্ব ছাড়াই বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করছিল। সম্প্রচারস্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ব্রাজিলে বিশ্বকাপের ম্যাচ সম্প্রচারের একচেটিয়া অধিকার ছিল গ্লোবো, এসবিটি এবং ক্যাজে টিভির হাতে। অথচ অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সেই ম্যাচগুলো সম্প্রচার করা হচ্ছিল।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (HSI) এবং ন্যাশনাল ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (IPR Center) যৌথভাবে এ তদন্ত পরিচালনা করে। অভিযানে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা, বেইন মিডিয়া গ্রুপ, এনবিসি ইউনিভার্সাল, ওয়ার্নার ব্রাদার্স, ইউএফসি এবং পাইরেসিবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট অ্যালায়েন্স ফর ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট (ACE) পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব অবৈধ স্ট্রিমিং সাইট শুধু কপিরাইট আইন লঙ্ঘনই করেনি, ব্যবহারকারীদেরও বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাদের মতে, অনুমোদনহীন স্ট্রিমিং সাইটে প্রবেশ করলে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে অজান্তেই ম্যালওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, ক্রেডিট কার্ডের নম্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চুরির ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কপিরাইট সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনলাইন ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
'অপারেশন রেড কার্ড' নামের এই বহুমুখী আন্তর্জাতিক অভিযানে পুরো আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অংশ নেয়। ডিজিটাল পাইরেসি এবং অবৈধ ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রির বিরুদ্ধে চালানো এই মেগা অপারেশনে দেশভিত্তিক বন্ধ হওয়া ডোমেইনের তালিকা:
- কলম্বিয়া: ১,১৪০টি
- ব্রাজিল: ৩০৯টি
- ডোমিনিকান রিপাবলিক: ২৫৬টি
- ইকুয়েডর: ২২৩টি
- পেরু: ২৮টি
- আর্জেন্টিনা: ১৪টি
ওয়েবসাইট ডাউন করার পাশাপাশি কলম্বিয়ায় নকল ক্রীড়াসামগ্রী তৈরি ও বিপণনের অভিযোগে ১৩টি বিশেষ তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হয়, যেখান থেকে চক্রের একাধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অপারেশনের দ্বিতীয় দফায় গত ১০ জুলাই কলম্বিয়ার সাইবার গোয়েন্দারা 'লস সিবেরইনফিলত্রাদোস' নামক একটি মারাত্মক সাইবার অপরাধী দলের চার সদস্যকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ২০২৪ সাল থেকেই চক্রটি টেলিকম কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে বিশ্বকাপসহ বৈশ্বিক সব বড় ক্রীড়া আসরের আইপিটিভি সংকেত চুরি করে তা অবৈধভাবে বিক্রি করে আসছিল। আসামিরা ভুয়া লগইন পেজ, ভিপিএন (VPN), সিকিউরিটি কোড জালিয়াতি ও করপোরেট নেটওয়ার্কে হ্যাক করে অবৈধ সম্প্রচার চালিয়ে আসছিল।
আমেরিকার বাইরে ইউরোপ মহাদেশেও ডিজিটাল পাইরেসির বিরুদ্ধে সমান্তরাল অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা 'ইউরোপল' এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারীরা ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে বৈশ্বিক অবৈধ স্ট্রিমিং নেটওয়ার্কগুলো চিহ্নিত ও নিশ্চিহ্ন করতে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যায়।
বিশ্বকাপের মতো মেগা স্পোর্টিং ইভেন্টে সম্প্রচারস্বত্ব ও স্বত্বাধিকারীদের অধিকার রক্ষায় চালানো এই মেগা অভিযানকে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পাইরেসি পুরোপুরি নিমূল করতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক অভিযান অব্যাহত রাখা হবে বলে নিশ্চিত করেছে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ।