বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী হত্যা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সীমান্তকে কার্যত একটি কিলিং জোনে পরিণত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফেলানী হত্যা থেকে শুরু করে নানা ঘটনার উল্লেখ করা যায়। ভারত বার বার সীমান্তে হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১,৫০০ সাধারণ ও বেসামরিক বাংলাদেশি হত্যার অভিযোগ আছে। একটি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন নিহত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। বিএসএফ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক পুশইনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুশইনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে ভারতের নয়াদিল্লিøতে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ৪ দিনের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু এতে খুব বেশি আশার বাণী শোনা যাচ্ছে না। বিশেষ করে পুশইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়সহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হলেও বুধবার পুশইনের চেষ্টার কারণে সীমান্ত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তগুলোতে একাধিকবার বন্দুকযুদ্ধের মুখোমুখি অবস্থান ও তীব্র বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুশইনের বিরোধিতা করায় কোনো কোনো পয়েন্টে বিএসএফ জওয়ানরা বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলির হুমকি দিয়েছে, যা দুঃখজনক। নয়াদিল্লিতে ৮ জুন থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন বৃহস্পতিবার শেষ হয়। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাহিনীর মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবার ‘অবৈধ পুশইন’ ও ‘সীমান্ত হত্যা’ বন্ধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। গত এক বছরে অন্তত দু’হাজার ৪৬৩ জনকে কোনো প্রকার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে ভারত। এর মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও রয়েছে। চলতি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও জামালপুর সীমান্তে কয়েক হাজার মানুষকে পুশইনের এমন বহু চেষ্টা বিজিবির কড়া সতর্কতায় ব্যর্থ হয়েছে।

আমরা মনে করি, নয়াদিল্লিতে যখন দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ে সীমান্ত বৈঠক চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সীমান্তে বিএসএফের এই পুশইনের হিড়িক ও গুলির হুমকি অত্যন্ত অশোভন। রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের মুখে ঠেলে দেয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সীমান্তে একতরফা ছাড় দেয়ার যে নীতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বিজিবি এখন দেশের সীমানা রক্ষায় যথাযথ পেশাদারিত্ব দেখাচ্ছে, যা প্রশংসনীয়।

আমরা মনে করি, বিজিবিকে অত্যন্ত জোরালোভাবে এ বার্তা দিতে হবে যে, নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না, আর হত্যাও বন্ধ করতে হবে। জানা গেছে সম্মেলনের কার্যবিবরণী চূড়ান্তকরণ ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিজিবির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় পুশইনের বিষয়টি অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী বলে উত্থাপন করা হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অধীন দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এটিই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। আমরা বিজিবির এই অবস্থানকে যথার্থ বলে মনে করি। আর সীমান্ত হত্যা ও অবৈশ পুশ ইন বন্ধ করতে হবে বিএসএফকে।